পুরী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা – সুপর্ণা ঘোষ

0
Share it, if you like it

সমুদ্রের প্রতি আমার একটা অমোঘ আকর্ষন আছে সেটা অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু এর আগেও বহুবার পুরী গিয়েছি তাই এবারে পুরী যাওয়ার কথা উঠতেই বাবাকে আগে থেকেই জানিয়ে দিলাম, এবার তবে খালি সমুদ্র আর কিচ্ছুটি না। কিন্তু সারাদিন সমুদ্রের ধারে কি করব সেটাও একটা সমস্যা। পুরীর আশেপাশে যে দর্শনীয় স্থান গুলি আছে তা আগে বেশ কয়েক বার দেখা হয়েগেছে। তাই এবার ভাবলাম যে পুরীর আশেপাশে এমন কোন জায়গায় যাবো যেখানে আগে কখনো যাইনি, বা গেলেও এবার নতুন ভাবে পুরী দেখব।

পুরী ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরী জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। এই শহর পুরী জেলার সদর শহর এবং বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে ৬০ কিমি দূরে অবস্থিত। পুরী হিন্দুদের চারধামের অন্যতম একটি ধাম হিসেবে বিখ্যাত। প্রাচীনকালে পুরী শ্রীক্ষেত্র এবং নীলাচল নামে পরিচিত ছিল। এই শহরে হিন্দুদের অনেক মন্দির ও মঠ আছে।

হাওড়া স্টেশন হয়ে রওনা দিলাম পুরীর পথে । পুরী স্টেশন পৌঁছে অটো ধরে চললাম স্বর্গদ্বারের দিকে। অটো যখন নিউ মেরিন ড্রাইভ রোডে উঠল তখন সমুদ্রের গর্জন আর হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। স্বর্গদ্বার থেকে যে রাস্তাটা শশ্মানের পাশ দিয়ে কাকাতুয়া খাজার দোকানের দিকে গেছে, সেই রাস্তা ধরে কিছুটা এগলেই রাস্তার পাশে একটা সস্তা অথচ বেশ ভাল এবং বাবার পরিচিত একটা হলিডে হোম আছে, আমরা উঠলাম সেখানেই।

পরদিন সকালে সময় মতো রওনা হলাম চেনা পথে অচেনাকে জানার জন্য। প্রথমে চেনা পথে পেলাম চন্দ্রভাগা সি বিচ। উড়িষ্যার কোনারকের এই সূর্য মন্দিরকে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য ইউনেস্কো বিশ্ব সভ্যতার একটি উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে । এয়োদশ শতকে পূর্ব-গঙ্গা রাজ্যের অধিপতি মহারাজ নরসিংহ দেব সূর্য দেবতার আরাধনার জন্য এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দির তার অভিনব আকার, বিশালত্ব আর কারুকার্যের জন্য প্রসিদ্ধ। তামিল শব্দ “কোণ” আর সংস্কৃত শব্দ “অর্ক” মিলে কোনার্ক শব্দটির সৃষ্টি। “কোণ” মানে “Angle” আর “অর্ক” মানে সূর্য। সূর্যের বিভিন্ন কোণ বা অবস্থান সময়ের বিন্যাস ফুটে উঠেছে এই মন্দিরে। ওড়িয়া ও দ্রাবিড় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে নির্মিত মন্দিরটি ধূসর বেলে পাথরে বিশাল একটি রথের আকারে গড়া। সূর্যের এই রথের মোট ৭টি অশ্ব-সপ্তাহের সাতবার নির্দেশ করে। একেক দিকে ১২টি করে মোট চব্বিশটি চক্র। এক একটি চক্র এক এক পক্ষকাল। চক্রগুলি মোটামুটি একই রকম, যদিও কারুকাজে তফাত আছে। রথচক্রগুলিতে আটটি বড় স্পোক এবং আটটি ছোট স্পোক আছে। বড় স্পোকগুলির মাঝে মোট আটটি এবং চক্রের মাঝে একটি গোলাকার অংশ রয়েছে। তাতে স্ত্রী, পুরুষ, মিথুনচিত্র, দেবদেবীর মূর্তি খোদিত রয়েছে। মন্দিরে সূর্যদেবতার যে বিশাল বিগ্রহ ছিল তা এখন নেই ।কালের করাল গ্রাসে স্থাপনার অনেকটাই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। ইতিহাস, স্থাপত্য শৈলি এবং সুপ্রাচীন কারিগরী কৌশলের জাদুদন্ডে এক লহমায় চলে গিয়ে ছিলাম অতীতে। মুগ্ধ বিস্ময়ে কোথা থেকে সময় কেটে গেল, বুঝতেই পারলাম না।

সন্ধ্যে ছুঁই-ছুঁই, ফেরার পথে খানিক গল্প হল সমুদ্রের সাথে চন্দ্রভাগা বীচে হুজুগে ভীড় এখনো হামলে পড়েনি এখানে। সমুদ্রের অপার বিস্তার, ঢেউয়ের ভাঙ্গা গড়ার মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সুযোগ আছে।

জগন্নাথ মন্দির

পর দিন আমাদের গন্তব্য জগন্নাথ মন্দির।পুরী আসবো আর জগন্নাথ দর্শন হবে না তা কি হয়! শোনা যায় পুরীর জগন্নাথ মন্দির নানা অলৌকিক রহস্যে ভরা৷ যেমন ধরুন্‌, মন্দিরের চূড়ার পতাকা বায়ুর উল্টো দিকে ওড়ে৷ মন্দিরের উপর আজ পযন্ত কোনো পাখি বসতে দেখা যায়নি৷ মন্দিরের ওপর দিয়ে কোনো বিমান,পাখি উড়ে যেতে পারে না৷ মন্দিরের রান্নাঘরের ভিতর দিয়ে গঙ্গানদী প্রবাহমান,যা বাইরে থেকে দেখা যায় না৷এসমস্ত প্রচলিত কাহিনী মন্দির টি আরও অলৌকিক রুপ দান করে। মন্দিরের পরিসর বিস্তৃত। মন্দিরের গোপন কক্ষে সাতটি ঘর আছে। সেই ঘরগুলিই হল রত্নভাণ্ডার। ৩৪ বছর আগে মাত্র তিনটি ঘরের তালা খুলতে সক্ষম হয়েছিলেন কর্মকর্তারা। বাকি ঘরগুলিতে কী আছে, তা আজও রহস্যই রয়ে গিয়েছে। শ্রীজগন্নাথের ‘ব্রহ্মবস্তু’র মতোই রত্নভাণ্ডারের রহস্য অধরাই রয়ে গিয়েছে। যে কক্ষগুলি খোলা সম্ভব হয়েছিল, সেখান থেকে উদ্ধার হয় ১৮০ রকমের মণিমুক্তো খচিত স্বর্ণ অলঙ্কার।প্রতি বিজয়াদশমী, কার্তিক পূর্ণিমা, পৌষ পূর্ণিমা এবং মাঘী পূর্ণিমার দিন শ্রীক্ষেত্রে ভক্তদের সামনে রাজবেশে দর্শন দেন মহাপ্রভু। তাঁর সেই সজ্জা দেখে ভক্তরা ধন্য ধন্য করেন।

সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে বেশ ক্লান্ত হয়ে গেলাম। মা বাবার কোন  কথা না শুনে এক রকম জোর করেই পুজো দিলেন। চার ধামের মধ্যে পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির অবশ্যই অন্যতম। সারাবছর ধরেই দেশে বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তরা জগন্নাথ দেশের দর্শনের জন্য পুরীর এই মন্দিরে এসে ভিড় জমান। এই ঐতিহাসিক জগন্নাথ মন্দির ১০৭৮ সালে তৈরি হয়। পুরীর রথযাত্রা :রথযাত্রা বা রথদ্বিতীয়া একটি আষাঢ় মাসে আয়োজিত অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। ভারতীয় রাজ্য ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে।

চিল্কা হ্রদ

পরদিন আমরা গেলাম চিল্কা লেক। ভারতবর্ষের বৃহত্তম আর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম উপহ্রদ । লেকটা সুবিশাল, তার মধ্যে দু’টো জায়গায় দু’টো ট্যুরিস্ট স্পট আছে – রম্ভা আর বারকুল । একটা বোট আমরা ভাড়া করেছিলাম । বোটে ২০ জনের বসার জায়গা আছে । মাথাটা পুরোটাই ছাউনি দেওয়া । বোটে চড়ার জন্য ও টি ডি সি-র নিজস্ব জেটির মতো আছে । সেখান থেকে বোটে চড়ে আমরা রওনা দিলাম ‘কালিজাই দ্বীপ’-এর দিকে । চিল্কায় একটা জায়গা আছে যেখানে গেলে ডলফিন দেখতে পাওয়া যায় (মানে গেলে দেখতে পাওয়া যাবেই এরকম কোনও কথা নেই – অনেকটা সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখতে পাওয়ার মতো ।এই জলপথে ভ্রমণটা খুবই সুন্দর ।

চিল্কার সঙ্গে সমুদ্রের যোগাযোগ আছে আর যেহেতু এর পরিসর সুবিশাল তাই এখানে ঢেউও আছে । তারই মধ্যে আমাদের বোট এগিয়ে চলল । রোদের তেজ বেশ বেশি হলেও জলের মধ্যে সেরকম গরম লাগে না – একটা ঠান্ডা হাওয়া বইতে থাকে ।প্রায় ৪৫ মিনিট চলার পর আমরা পৌঁছলাম কালিজাই দ্বীপ-এ । এখানে একটা কালিজাই দেবীর মন্দির আছে । দ্বীপটা সবমিলিয়ে খুব একটা বড় না, পুরোটা হেঁটে ঘুরতে বড়জোর ঘন্টাখানেক লাগে। আর সত্যি কথা বলতে কি ঘুরে দেখার মতো সেরকম কিছু নেইও । দ্বীপের মধ্যে একটা ছোট্ট টিলা আছে আর এর ওপরে একটা ছাউনি দেওয়া জায়গা । আমরা সেই ছাউনিটার ওপরে উঠলাম । এটাই দ্বীপের সর্ব্বোচ্চ জায়গা । এখান থেকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় ।এখানে জানিয়ে রাখি চিল্কা হ্রদ হিসেবে সুবিশাল হলেও আদপে এটা একটা হ্রদই, তাই সমুদ্রের মতো সবসময়ে এখানে হাওয়া দেবে এরকম আশা করা ঠিক নয় । বিশেষ করে মাঝে মাঝে বেশ গুমোটই লাগে । তবে জলের ধারে জায়গা, তাই বাতাসে আর্দ্রতা বেশি, তাই গরমে গা পুড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নেই।

ভূবোণেশ্বড়

সকালে ট্যাক্সি রিজার্ভ করে ভুবনেশ্বর শহর দেখতে বের হই। চওড়া রাস্তা। যানবাহন আর লোক-চলাচল খুবই কম। লোকগুলো কৃষ্ণ বর্ণের। ভাষা খুবই জটিল। ট্যাক্সিচালক গণেশ থাপা বললেন, “ওড়িশার আরো নাম রয়েছে—‘কলিঙ্গ’, ‘উত্কল’, ‘উড্রদেশ’। কলিঙ্গ রাজার দেশ বলে এর নাম ‘কলিঙ্গ’। ২৬১ খ্রিস্টপূর্বে এই কলিঙ্গ রাজার সঙ্গে সম্রাট অশোকের যুদ্ধ হয়। তাতে মৃত্যু হয় দেড় লাখ মানুষের। এত প্রাণহানির ঘটনায় অশোক বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি শপথ নেন, আর অস্ত্র নয়, আর যুদ্ধ নয়, ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে হবে। সাত শতকে ওড়িশা থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উত্খাত করে হিন্দু ধর্ম। এরপর হিন্দু রাজারা ৫০০ বছর তাঁদের রাজত্বে ওড়িশাকে দৃষ্টিনন্দন মন্দির দিয়ে সাজান। বারো শতকে এসব মন্দিরের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়।” ট্যাক্সিচালকের কথায় আরো জানতে পারি ভুবনেশ্বর হচ্ছে পাহাড়, সমুদ্র, মন্দিরের রাজধানী। ওড়িশা সরকারের ট্রাভেল অফিসে গিয়ে ভুবনেশ্বর দর্শনের টিকিট কাটি। এসি বাসের টিকিটের দাম ৫০০ টাকা।

কয়েক মিনিট চলার পর গাইড বললেন, ‘এই সফরে ভুবনেশ্বরের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে মন্দির, চিড়িয়াখানা, সাফারি পার্ক, গুহা ছাড়া আরো কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখানো হবে। ৫০০ টাকার এই প্যাকেজের জন্য দর্শনীয় স্থানে ঢুকতে আর কোনো টিকিট লাগবে না।’ ১০ মিনিট পরেই তিনি বললেন, ‘১৫ মিনিটের বিরতি। পেট পূজা করে নিন।’ বাস থেকে নেমেই দেখি, দুটি হোটেলে ভিড়। খাবারদাবারে ধোঁয়া উড়ছে। ভাপা পিঠার মতো ইডলি আর আলুর পাকোড়া ছাড়া অন্য কোনো খাবার নেই। নানা রকম চাটনি দিয়ে তা-ই খেয়ে নিলাম।

বাস আবার ছুটছে। বেশ কয়েক কিলোমিটার পর আমাদের বাস থামল। ফুল বাগান আর পাহাড়ের পাথর ডিঙিয়ে আমরা হাঁটতে থাকি। গাইড বললেন, এ হচ্ছে উদয়গিরি আর খণ্ডগিরি গুহা। প্রথমে অনেক সিঁড়ি ডিঙিয়ে ডান পাশের উদয়গিরির ভেতর ঢুকি। এটি হচ্ছে বৌদ্ধ গুহা। দুই শতকে পাথর খুঁড়ে ১২৩ ফুট উঁচুতে বৌদ্ধ সাধুদের বসবাসের জন্য এই উদয়গিরি তৈরি করা হয়। লালচে রঙের পাথরের গুহার ভেতর নানা ধরনের টেরাকোটাসদৃশ কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হই।

উদয়গিরির পাশে খণ্ডগিরিও অনেক উঁচু। ১১৩ ফুট উঁচু এই জৈন গুহাও রহস্যঘেরা। এর চূড়ায় রয়েছে জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর হিন্দু মন্দির। দুই গিরি দেখতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এরপর আমাদের বাসে করে একটি পাহাড়ের পাদদেশে নামিয়ে দেওয়া হয়। গাইডের পিছু পিছু সিঁড়ি ভেঙে এগোতে থাকি। প্যাঁচানো অনেক সিঁড়ি ভেঙে ধৈলী পাহাড়ের শান্তি স্তূপের পাদদেশে এসে পৌঁছি। এখানেই সম্রাট অশোকের সঙ্গে কলিঙ্গ রাজার যুদ্ধ হয়েছিল। আর যুদ্ধের পর অশোক এখানেই ধ্যানে বসেন। ১৯৭০ সালে এই স্থানে খুবই সুন্দর সাদা ধবধবে শান্তির প্রতীক ‘পিস প্যাগোডা’ নির্মাণ করা হয়। প্যাগোডার ভেতর গৌতম বুদ্ধ বসে আছেন। শান্তির এই স্থাপনা দেখে নামার সময় চোখে পড়ে পাহাড়ের ভেতরে ছোট ছোট দোকান। সেখানে কাজুবাদাম, পোস্তদানা, এলাচ, জায়ফল বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি কাজুবাদামের দাম নাকি ২০০ টাকা। এখানে প্রচুর কাজুবাদামের চাষ হয়। ফলে দামটা বেশ কম। এই সুযোগ তো আর হারানো যায় না। কিনে ফেললাম ।

এরপর আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো বিরাট আকৃতির একটি মন্দিরের সামনে। এই মন্দিরের নাম ‘লিঙ্গরাজ মন্দির’। গাইড বললেন, ‘হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ছাড়া এই মন্দিরে অন্য ধর্মের কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এ ছাড়া চামড়াজাত দ্রব্য নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ।’ মন্দিরের বাইরে দাঁড়াই আমরা। মন্দিরের এক সেবায়েত জানালেন, ‘১০৮টি মন্দির নিয়ে এই লিঙ্গরাজ মন্দিরের সৃষ্টি। এক হাজার সালে গঙ্গা রাজা ললাট কেশরী এই মন্দির তৈরি করেন। এখানে ভগবান শিবের লিঙ্গ বিগ্রহ আছে।’ এই মন্দির দেখার পর আমাদের ভুবনেশ্বর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই চিড়িয়াখানার ভেতর সামুদ্রিক মাছের একটি জাদুঘর আছে। চিড়িয়াখানার প্রবেশমূল্য ১০০ টাকা।

প্রথমে মাছের জাদুঘরে অপরূপ অ্যাঞ্জেল ফিশ, শার্ক, গোল্ডফিশ, স্টারফিশসহ নানা প্রজাতির দুর্লভ সব সামুদ্রিক মাছ দেখি। এরপর ছোট একটি ব্যাটারিচালিত বাহনে চড়ে হারিয়ে যাওয়া শকুন, লাভ বার্ড, সাদা বাঘ, সাদা কুমির, গরিলা, গণ্ডার, চিতাবাঘ ছাড়াও নানা রকম জীব-জন্তু দেখি। ঘণ্টাখানেক পর আমাদের একটা জেল কয়েদি নেওয়ার বাসে তোলা হয়। পুরো বাস মোটা মোটা লোহার শিক দিয়ে ঘেরা। গাইড বললেন, ‘আমরা লায়ন সাফারি পার্কের উদ্দেশে যাত্রা করছি।’ কয়েক মিনিট ছোটার পর বিরাট একটি লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় বাসটি।

আমাদের অবাক করে দিয়ে প্রবেশপথটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। কয়েক হাত পরে ফের আরেকটি গেট পার হয়ে গভীর অরণ্যের ভেতর তৈরি লাল পথ ধরে ধীরে ধীরে বাস ছুটতে থাকে। বাসচালক জানান, এখন সিংহ দেখতে পাবেন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকুন। একটু পরেই শোনা যায় সিংহের গর্জন। একটা সিংহ আমাদের বাসের দিকেই তেড়ে এলো। খানিকটা পথ যাওয়ার পর দেখি, এক সিংহ দম্পতি রাস্তার পাশেই বসে খুনসুটি করছে। বাস এখানে থামে। এখানে খানিকটা সময় কাটিয়ে গেলাম বাঘের সাফারি পার্কে। সেখানে বহু বাঘ দেখতে পাই। বেশির ভাগ সাদা রঙের। কিন্তু বাঘের পার্কেই দেখি একটি বিশাল আকৃতির ভালুক আমাদের বাসের পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে কিছু একটা চাইছে যেন। দু-একজন অতিউৎসাহী চিপস ছুড়ে দিল। সেগুলো দিব্যি খেয়ে নিল ভালুকটা। বোঝাই যাচ্ছে, এসবে ও বেশ অভ্যস্ত।

সন্ধ্যা নেমে আসে। চারদিকে বাঘের গর্জন শোনা যেতে লাগল। গাইড বললেন, ‘১৯৬০ সালে এই নন্দনকানন চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা হয়। এখানে ২০০ সাদা বাঘ রয়েছে। কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শাল-সেগুন অরণ্যের এই দুটি সাফারি পার্ক ভারতের অন্যতম।’ নন্দনকানন ঘুরে সেই দিনের মতো হোটেলে ফিরি।

পুরীতে  প্রধান আকর্ষণ দু’টো। জগন্নাথ আর সমুদ্র। সমুদ্রের টানকেও কোনো ভাবে এড়িয়ে যাওয় যায় না। গা না ভেজালেও তাতে মন ভিজতে বাধ্য। রাতের গহন অন্ধকারে যেমন সে রহস্যময়, দিনে তেমনই আনন্দ-উচ্ছ্বল। রাতে সমুদ্রের গভীর কালো অন্ধকারে মিটিমিটি জ্বলতে দেখা যায় জেলেদের নৌকোর লণ্ঠন। দিনরাত এক করে ভাসছে অজানা নিয়তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে। আবার পূর্ণিমার রাতে ঢেউয়ের সাদা ফেনা মুক্তোর মতো চিকচিক করে ওঠে। আর সকাল হলেই সমুদ্রকে ঘিরে কত ‘হাসি-কান্না হীরা-পান্না, দোলে ভালে’। বিশেষ করে স্নান করতে গিয়ে ছবি তোলার কাণ্ডকারখানা দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। মন ভরিয়ে দেয় সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের আকাশ-সমুদ্রে রঙের খেলা। আর ঢেউদের ওঠা-পড়া কানে কানে উদাসী মনকে বলে যাবে অনেক কিছুই।

— সমাপ্ত —

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

অন্যান্য লেখা

Leave A Reply