ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র

0

ছেলেটা লিখতো ভালোই। বেশি লেখা আমি পড়িনি, তবে সে ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রূপে লেখা দিয়ে বন্ধুদের ট্যাগ করলে বা নিজের ফেসবুক দেওয়ালে পোষ্ট করলে প্রচুর লাইক আর কমেন্ট আসতো। আমি না হয় অলস, লেখা পড়ি না, তাই বলে এই সব মানুষ তো লেখা পড়ে কমেন্ট করে। অবশ্যই সে হয়তো ভালো লেখে।

প্রথমেই পরিচয় করে নিলাম। ছেলেটা নিজেকে দরিদ্র ও সৎ হিসাবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। ও পৃথিবীর সকল মানুষের থেকে আলাদা, খুবই সৎ, চরিত্রবান ও দরিদ্র, এটা সে বারবার নিজের কথায় বা হাবভাবে প্রকাশ করতে থাকে। আমিও অবুঝের মতো সব হজম করে নিয়ে মাঝে মাঝে ওকে একটু উষ্কে দিতাম, আবার সেই ছেলেটা দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করতো।

তার সাথে যখনি চ্যাট মারফৎ কথা বলতাম, তখনি সে তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা আর দরিদ্রতার প্রসঙ্গ তুলে ধরতো। মাঝে মাঝে বর্তমান রাজ্য সরকার কে গালিগালাজ করে আদর্শ দেশ প্রেমি হিসাবেও প্রমান দিতো। আমি চিরকাল স্রোতা হিসাবে খুবই উৎকৃষ্ট মানের। আমি ওর কথা মন দিয়ে শুনে, ওর হ্যাঁ য়ে হ্যাঁ মেশাতাম। ওর হ্যাঁ আর আমার হ্যাঁ মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত, ঠিক যেমন রোজ সকাল সকাল কোন এক গোয়ালা দুধের বালতীতে টুক করে দুই পোয়া জল মিশিয়ে দুধের পরিমান বাড়িয়ে নেয়।

এ সব করার পিছনে আমার একটাই নিষ্পাপ উদ্দেশ্য ছিল। আমি মশাই লাইক আর শেয়ারের কাঙ্গাল। আমার একটা ফেসবুক পেজ আছে, কিন্তু বহুদিন ধরে চালিয়ে তেমন কোন নাম বা পরিচিতি করতে পারিনি। অনকেই অ্যাডমিন হওয়ার প্রলোভন দেখিয়েও দলে টানতে পারিনি। কারন এখন সকলেই যে যার নিজের পেজের অ্যাডমিন। ফেসবুকে বাংলায় যত না প্রোফাইল আছে, তার তিন গুন বেশি পেজ গজিয়েছে, ঠিক জেন ব্যাঙের ছাতা।

আমি চেয়েছিলাম, ছেলেটি যদি তার লেখা আমাদের পেজে শেয়ার করে তবে আমারা দু একটা লাইক পেলেও পেতে পারি। ধরুন একটা লেখা সে নিজের প্রোফাইলে পোষ্ট করল, ৮০-১০০ লাইক আর ৩০-৪০ টা কমেন্ট। এবার ধরুন সেই একই লেখা সে আমাদের পেজে পোষ্ট করে, তবে অন্তত ১০% লাইক ও কমেন্ট আমাদের পেজে পেতে পারে। বিশ্বাস করুণ, এইটুকু ছিল আমার সাদা মনের কাদা।

পরিচয় হওয়ার পরে আমি আস্তে আস্তে আমার খাপ খুললাম। আমার প্রস্তাবে সে রাজিও হল। দুটি লেখা সে আমাদের পেজে শেয়ার করল এক সপ্তাহের। আমি তো বেশ ভালো করে ওর পায়ে তেল লাগাতে শুরু করলাম। আমি ভেবে ছিলাম আমাদের এই অচল পেজ এবার সচল হয়ে উঠবে। কিন্তু কিছু দিন যাওয়ার পরে বুঝলাম আমি যা ভাবছি তা মটেই ঘটছে না। আমাদের পেজে সে লেখা দিয়েছে ঠিকই কিন্তু সেটা সে কোনদিনই নিজের প্রোফাইলেও শেয়ার করেনি। 

আমি তার ফেসবুকের দেওয়াল উপর থেকে নিচে অব্ধি হাৎড়ালাম, কিন্তু আমাদের পেজের নাম গন্ধ নেই। তার দেওয়ালে শুধু গিজগিজ করছে অন্যান্য গুপের লিঙ্ক যেখানে তাকে সম্মান স্বরূপ“ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র”দেওয়া হয়েছে। ছেলেটি সেই সব পেজের বা গ্রুপের পোষ্ট নিজের দেওয়ালে শেয়ার করতো যারা তাকে প্রত্যেক সপ্তাহে ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র দিয়ে থাকতো। আমাদের পেজে তার ওই দুটি লেখাই শেষ লেখা ছিল। তার পরে আর কোন লেখা সে দেয়নি। আমি লেখা দিতে বললেই বলতো সে খুব গরীব, ভোর সকালে উঠে সব্জির দোকান লাগায়, সারাদিন দোকানদারি করে, সন্ধায় খেয়ে দেয়ে আবার তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, তাই সে লেখা দেওয়ার সময় পাচ্ছে না। কিন্তু এদিকে তাকে সারাদিন অনলাইন দেখায় এবং বিভিন্ন গ্রুপের পোষ্টের কমেন্টে উত্তর করতে দেখা যায়। যেমন, “প্রাপ্তি”, “আশীর্বাদ করবেন”, “অনেক ভালোবাসা”, “সঙ্গে থাকবেন” ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি সেদিন রাতে অনেক ভাবলাম, কেন সে আমাদের পেজে লেখা দেয় না, আবার এদিকে অন্য গ্রুপে ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র পাচ্ছে পটাপট। শেষমেশ আমি বুঝলাম যে, যে সব পেজ বা গ্রুপ অকে ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র দেয়, শুধু মাত্র সে তাদের পেজেই লেখে। আমি ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র দিচ্ছি না তাই আমাদের পেজে লিখছে না। সেদিন রাতেই আমি গু-গুলে খুঁজে খুব সুন্দর সুন্দর অভিনিন্দ পত্রের টেম্পলেট ডাউনলোড করে ফেললাম। খুব সুন্দর করে তার জন্য একটা ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র বানিয়ে পেজে পোষ্ট করলাম আর তাকে ট্যাগ করলাম। সে ছেলে এত বেস্ততার মধ্যেও রাত ১.৩০টার সময় আমাকে পিং করলো, যখন তার ঘুমানোর সময় কারন সে গরীব, এবং সকালে উঠে সব্জির দোকান খুলতে হবে।

আমি অবাক! একটা গরীব মানুষ এত রাতে ফেসবুক করছে কেন? এখন তো তার ঘুমানোর সময়!! আমি খুবই অবাক হওয়ার ভান করে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এত রাতে ফেসবুকে কেন ভাই? সে উত্তরে বলল ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে তাই ঘুম আসছে না, তাই একটু ফেসবুক করে মন ফ্রেস করছিলো।

প্রথমে তো ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র দেওয়ার জন্য আমাকে ধন্যবাদ দিলো। তার পর শুরু করলো সেই প্যানপ্যানানি কথা বাত্রা। কেন তাকে ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র দিলাম? সে ফেম চায় না ! লিখতে ভালো লাগে তাই লেখে ! এসব ফেসবুকে দিতে ভালো লাগে না! সে খুব সৎ ! ইত্যাদি ইত্যাদি। সেদিন রাতে আমি আর আমার ধৈরযের বাঁধ ধরে রাখতে পারলাম না। ঠোঁটকাটার মত মুখের উপরে বলে দিলাম, “ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র দিয়েছি যাতে তুমি আমাদের পেজেও দু একটা লেখা দাও। ফেসবুকের অভিনন্দন পত্র না দিলে তো তুমি লেখাই দাও না”। ব্যাস!!! ছেলেটি এবার আগ্নেয়গিরি মত গরম বাতাস, জলীয় বাষ্প, গলিত শিলা, কাদা, ছাই, গ্যাস প্রবল বেগে ওগরাতে শুরু করলো। 

আগ্নেয়গিরি হলো বিশেষ ধরনের পাহাড় যার ভেতর দিয়ে ভূ-অভ্যান্তরের উত্তপ্ত ও গলিত পাথর, ছাই এবং গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এটি একটি ভৌগোলিক প্রক্রিয়া। ঠিক এমনই বিশেষ ধরনের মানুষ ও থাকে আমাদের চার পাশে। উপর থেকে দেখতে খুবিই সৎ ও চুপচাপ, কিন্তু মাঝে মাঝে এরাও নিজের ভিতরের রাগ আর চাপা কথা বার করে ফেলে আগ্নেয়গিরি মত। প্রথমেই সে নিজের সম্মান বাঁচাতে আমার সাথে অভদ্র ব্যাবহার শুরু করলো। আমি যতই ভদ্র ভাবে কথা বলি, সে ততই অভদ্র ভাষা ব্যাবহার করতে শুরু করে। আর তার কথার মাঝে মাঝেই সেই একই বুলি, “আমি সৎ, খুব গরীব, আমি লিখতে ভালোবাসি তাই লিখি, ফেসবুকে পোষ্ট করার জন্য লিখি না, ইত্যাদি ইত্যাদি”। সে আমাকে বার বার তার প্রতিবেশীকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে বলছে, যে সে কেমন ছেলে। পাঠক, এবার আপনারাই বলুন, আমি থাকি পশ্চিমবঙ্গের এক প্রান্থে, আর এই মহাপুরুষ থাকে অন্য পারান্তে, কি করে আমি ওর প্রতিবেশীদের থেকে ওর চরিত্র-পত্র নেবো? আর যদিও আমি সেখানে যাই, আমার যাওয়া আসার খরচা কে দেবে?

সত্যি বলতে আমার আর ওই প্যানপ্যানানি শুনতে ভালো লাগছিলো না। আমি সেদিন বলেই ফেললাম – “নিজে যারে ভালো বলে ভালো সে নয়লোকে যারে ভালো বলেভালো সেই হয়“। আমি এখন তার প্রোফাইল ফেসবুকে খুঁজে পাচ্ছিনা। তাহলে কি আমি Blocked ??

Share.

About Author

আমার নিঃশব্দ কল্পনায় দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি, আমার জীবনের স্মৃতি, ঘটনা, আমার চারপাশের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে লেখার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষেরই ঘন কালো মেঘে ডাকা কিছু মুহূর্ত থাকে, থাকে অনেক প্রিয় মুহূর্ত এবং একান্তই নিজস্ব কিছু ভাবনা, স্বপ্ন। প্রিয় মুহূর্ত গুলো ফিরে ফিরে আসুক, মেঘে ডাকা মুহূর্ত গুলো বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ুক। একান্ত নিজস্ব ভাবনা গুলো একদিন জীবন্ত হয়ে উঠবে সেই প্রতীক্ষাই থাকি।

Leave A Reply