রাতের ট্রেনের আগন্তুক

0
Share it, if you like it

অন্ন বস্ত্র বাসস্থান, মানুষের প্রধান প্রয়োজন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় না হলেও চলে, কিন্তু প্রথমটি কে বাধ্যতামূলক করে পাঠিয়েছেন সৃষ্টি কর্তা। আমাদের পেট ভর্তি থাকলে আমরা ক্ষুধার জ্বালা বুঝবো না। কবি এই জন্যই বলেছেন, “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”।

সেদিন তারিখ ১৩আগস্ট, রাত ১১টা, শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর ফিরছি লোকাল ট্রেনে। বেশী রাত হওয়ায় ট্রেনের কামরায় ৩০ – ৪০ জনের বেশি ছিল না। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই অফিস ফেরৎ নিত্য যাত্রী। যারা এমন সময় ট্রেনে যাত্রা করেছেন, অবশ্যই খেয়াল করেছেন যে এই সময় ট্রেনের কামরায় বেশ একটা ঝিমুনি ভাব থাকে। কেউ এদিকে ঢুলছে, কেউ ওদিকে ঢুলছে। কেউ আবার কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বন্ধ করে ঢুলছে। কিছু দৈনিক যাত্রী তাস পেতে, কেউ স্টিলের টিফিন কৌটা খুলে মুড়ি চেবাচ্ছে। এই সময় যাত্রী ও হকারের চাপ খুবই কম থাকে, এই সময় তো বাড়ি ফেরার সময়। দু একটা রানাঘাটের মুচমুচে চিপ্স, চিড়ে ভাজা আর খাস্ত গজার ফেরিওয়ালারা ছাড়া অন্য কোনো হকার থাকে না।

সাধারণত আমার মতো নিতান্ত স্টুডেন্ট কেউ থাকে না, আর সেদিন রাতেও ছিলো না। ইতি মধ্যে ট্রেন ব্যারাকপুরে আসায় সকলে একটু নড়েচড়ে বসলো। বেশ কিছু মানুষ নামলো, আর মাত্র কয়েকজন উঠলো। এই কয়েক জনের মধ্যে একটি পাগল গোছের লোকও উঠেছিলো। উসকো-খুসকো চুল, গালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, পরণে ময়লা জামাকাপড়। গরম এড়াতে আর একটু নায়ক মনোভাব নিয়ে আমি দাড়িয়ে ছিলাম ট্রেনের দরজার পাশেই। মাঝে মাঝে একটু মাঝখানের রড ধরে মুখ বাইরে বার করে হওয়া খাচ্ছিলাম। বেশ ফুরফুরে হাওয়া লাগছিল, শরীরের ক্লান্তি দূর হচ্ছিলো।

Image courtesy: https://deskgram.net/ravi_007

Image courtesy: https://deskgram.net/ravi_007

এদিকে ওই লোকটি ট্রেনে উঠেই চাকুরিজীবি, অফিস ফেরৎ, চৌকো কালো ব্যাগধারী মানুষদের কাছে হাত পাততে শুরু করেছি। কেউ আধ খোলা চোখে একটু দেখে নিয়ে আবার চোখ বন্ধ করলো, কেউ খোলা চোখে দেখেও দেখতে পেলো না। কিছুক্ষন হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে, তার পরে একটু এগিয়ে আবার অন্য জনের সামনে। ট্রেনের কামরায় এমন দৃশ্য মাঝেমাঝেই দেখা যায়। আমাদের চোখে এটা অতি সাধারণ, আমাদের চোখ সয়ে গিয়েছে এই দৃশ্যে। তখন ট্রেনের কামরায় ১৫-২০ জন হবে হয়তো। লোকটি একে একে সকলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে, বাম হাতের তালুর উপরে দান হাতের তালু রেখে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে তার পর আবার অন্য জনের সামনে। যখন একে একে সকলের সামনে হাত পেতে কিছু খাবার জন্য পেলো না, কেউই তাকে একটি পয়সাও দিল না, খুবই স্বাভাবিক ভাবে একটা ফাঁকা জানলার পাশের সিটে গিয়ে বসে পড়লো লোকটি।
আমরা অনেকেই দেখেছি বা শুনেছি, ট্রেনে কিছু অল্প বয়সী ছেলে এবং মাঝ বয়সী মানুষ ভিক্ষা করে, আবার সেই ভিক্ষার টাকা দিয়ে মাদক কিনে নেশাও করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন ভিডিও আমরা মাঝেমধ্যেই ভলি বল ছোড়ার মতো একে অপের সাথে শেয়ার করি। ট্রেন লাইনের ধারে অনেকেই ডেনড্রাইটের নেশা করে। এক বেলা পেট ভরে খেতে পায় না, তবু নেশা চাই। প্রথম দিকে আমিও এটাই ভেবেছিলাম।

কিন্তু সেদিনের ঘটনা একটু অন্য। পরে আমি বিষয়টা খেয়াল করলাম। লোকটা প্রায় সবার কাছেই হাত পেতেছিল কিন্তু ফলাফল শুন্য। অবশ্য আমার কাছে কিছু চায়নি, হয়তো ভেবেছে গেটে যারা ঝোলে তারা ভিক্ষা টিক্ষা দেয় না। সত্যি বলতে এরা দেয়ও না। অতঃপর লোকটি নিরুপায় হয়ে, প্রথমে সিটে বসেই নিচু হয়ে ট্রেনের সিটের তলায় কিছু একটা দেখলো, তার পর নিচের নেমে গিয়ে পড়ে থাকা নোংরা মুড়ি কুড়াতে শুরু করেছিল। ঘটনাটি আমার ৪ হাত দুরত্বের ও কম দুরত্বে ঘটে চলেছে। তখনো আমার কিছু মনে হয়নি। কিন্তু যখন দেখলাম নোংরা পড়ে থাকা মুড়িগুলি কুড়িয়ে নিয়ে ফু দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করছে, এক ঝটকায় আমার মেরুদন্ড দিয়ে একটা বিদ্যুতের আলতো ঝটকা অনুভব করলাম। চোখের সামনে লোকটি নোংরা মুড়ি কয়টি মুখে তুলতে যাচ্ছে, তখন আর আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। নিজের সব শক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, “আইইই!!” সকলেই প্রায় চমকে উঠলো, সঙ্গে এই লোকটিও। লোকটি আমার সাথে চোখা চোখি হতেই আরো বেশি ঘাবড়ে গেলো। কাছে গিয়ে আমি তাকে সেগুলো ফেলে দিতে বললে, সে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। কেউ কোনো অপরাধ করে ধরা পড়ে গেলে যেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়, এই দৃষ্টি একদম সেই দৃষ্টি। না, সে কোনো অপরাধ করেনি, সে শুধু মাত্র পড়ে থাকা নোংরা মুড়ি কুড়িয়ে খেতে গিয়েছিল নির্বোধ শিশুর মতো। নির্বোধ শিশু কিছু না বুঝে পড়ে থাকা কিছু তুলে মুখে দেয় আর এই মানুষটি ক্ষিদের জ্বালায় সেই একই কাজ করেছে।
লোকটি মুড়ি ফেলল না। হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। এদিকে অন্য যাত্রীদের দৃষ্টি আমাদের দুজনের দিকে। সকলের মনে হয়তো টানটান উত্তেজনা, কি হতে চলেছে এর পর? বাংলা সিরিয়ালের শেষের দিকে যেমন হয়, দর্শক কে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলা হয় আগামী পর্বে দেখুন। যেমন পটল কুমার কি পারবে পটলের দোরমা রান্না করতে? দেখুন আগামী কাল, অথবা ঝিলিক কি পারবে তার মা কে ছাড়া ঘুমাতে?

লোকটি ছলছল চোখ নিয়ে প্রায় ধরা গলায় বলেই ফেললো, “খোকা সারাদিন কিছু খাইনি”, বলেই ধপ করে বসে পড়লো আমার সামনেই। কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। পিঠ ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিলাম তার দিকে। তখন আমার সঙ্গে কোনো খাবার ছিল না। লোকটি হাতের নোংরা মুড়ি ফেলে দিয়ে দু হাতে হাত ঝেড়ে জল নিলো, মুখ না লাগিয়ে উঁচু করে কয়েক ঢোক জল খেলো।

তারপর এক আগন্তুক হকারের থেকে আমি ৪ প্যাকেট চিড়ে ভাজা কিনলাম। আমি যখন তাকে চিড়ে ভাজার প্যাকেট গুলো দিলাম, তখন তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আনন্দের ছাপ দেখতে পেলাম। ট্রেনের কামরা এতক্ষনে স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ মনে মনে ভাবছি, “যত সব নাটক, কদিন খাওয়াবে এই ভাবে, বা কত জন কে খাওয়াবে?”

আমি অবশ্য সচরাচর কিছু কাউকে দিইনা, বড়ো হয়ে দেওয়ার অভ্যাস চলে গিয়েছে, অবশ্য ছোট বেলায় দিতাম। জানি এই সব লোকেদের মধ্যে অনেক ধান্দাবাজ লোকও থাকে, অনেকে নেশা খোর মানুষও থাকে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি দেখে সত্যি মনটা কেমন করে উঠল। লোকটা সত্যি একটু পাগলা গোছের। পরম তৃপ্তিতে একে একে ৪ প্যাকেট চিড়ে ভাজা খেয়ে নিলো। তার চোখে মুখে ফুটে উঠলো একটা স্বচ্ছল ভাব, যেন কিছুই হয়নি। লোকটার পরিচয় জানি না, নাম ধাম জানি না। হয়তো জিজ্ঞাসা করলে বলতো। আমার আর এই ৪ প্যাকেট চিড়ে ভাজা খাইয়ে ইন্টারভিউ নিতে ইচ্ছা করলো না। হয়তো ঘটনাটার ভিডিও বানিয়ে, তার ইন্টারভিউ নিয়ে আমি মহান সাজতে পারতাম, কিন্তু ব্যাপারটা কেমন ঠিক মনে হলো না।

জানি, যাদের টাকা আছে তাদের কেউই হয়তো এই সব মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য এগিয়ে আসে না। আর এটাও জানি আমার মতো এক সামান্য স্টুডেন্টের কিনে দেওয়া চিড়ে ভাজাতে ওদের পেট ভরবে না, শুধু মাত্র ক্ষুধা নিবারণের প্রয়াস করলাম মাত্র। আমি শুধু মাত্র আমার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলাম আপনাদের কাছে, আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।

“দেখ ভাল জনে রইলো ভাঙ্গা ঘরে
মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে
ও ভাই সোনার ফসল ফলায় যে তার
দুই বেলা জোটে না আহার
হিরার খনির মজুর হয়ে কানাকড়ি নাই”

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

অন্যান্য লেখা

Leave A Reply