আমার জন্ম তারিখ রহস্য

0
Share it, if you like it

২০০৬ এ, আমার জন্ম তারিখ নিয়ে বেশ একটা বড়সড় তদন্ত চালিয়েছিলাম আমি। পুরনো পঞ্জিকা থেকে শুরু করে Google তোলপাড় করে ফেলেছিলাম। সমস্যাটা শুরু হয় জীবনের প্রথম email বানানোর সময়। আপনারা শিক্ষিত ইন্টারনেট সচ্ছল মানুষ সকলেই, অবশ্যই জানবেন যে email বানানোর সময় জন্মের তারিখ দেওয়া  আবশ্যক। আমার জন্ম তারিখ ৬ই কার্ত্তিক। এবার এই বাংলা তারিখ তো আর আমি email এ দিতে পারবো না। এবার আপনারা অনেকেই বলবেন, “Birth certificate এ তো ইংরাজি তারিখ আছে, এত ভনিতা করার কি আছে?” 

আপনারা তো শিক্ষিত ভদ্র সমাজ, কিছু একটা বলেই খালাস। ভিতরের খাবর তো আপনারা জানেন না। প্রথমত আমার জন্ম বাড়িতেই, দ্বিতীয়ত আমার জন্মে পত্র নেই। সেকালে হয়তো কলকাতার বা শহরের মানুষ এই সব নিয়ে ভাবতো, তবে গ্রাম বাংলার অনেক মানুষই এই সব নিয়ে মাথা ঘামাতো না। আমার জন্ম ৮০র দশকের শেষের দিকে, শৈশব আর কৈশোর কেটেছে ৯০এর দশকে। মেয়েরা যেমন বয়স লুকাতে পছন্দ করে, সেই রূপ আমিও তাদের পথ অনুস্মরণ করেছি। জন-সম্মুখে আমি আর আমার জন্মের সাল বা বঙ্গাব্দ প্রকাশ করলাম না।

যাইহোক, জন্মের পর থেকে বড় হতে কোন সমস্যা হয়নি আমার। Birth certificate অর্থাৎ জন্ম প্রমান পত্র ছাড়াই আমি ধাপে ধাপে বড় হচ্ছিলাম। প্রথম সমস্যার সম্মুখীন হলাম ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার সময়। জন্ম তারিখ তো আর মুখে বললে চলবে না, প্রমান হিসাবে সরকার বাহাদুরের কাগজ লাগবে। আর তার থেকে বড় কথা বাংলা জন্ম তারিখ লিখতে ইস্কুল কেমন যেন কিন্তু কিন্তু করছিল। আচ্ছা কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম দিন কবে ছিল যেন? সবাই হাত তুলে উত্তর দেবেন যে, “২৫সে বৈশাখ “। এবার যদি বলি ইংরাজি তারিখ কত? ৯৫% মানুষ এবার Google এ খোঁজা শুরু করবে, এবং Wikipedia খুলে দেখবেন যে, 7 May 1861. কবি গুরু শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের ছেলে, ওনার জন্মের দুটি তারিখ সবাই মনে রেখেছে। কিন্তু আমি তো ছোট্ট একটা গ্রামের মদ্ধবিত্ত চাষা পরিবারের ছেলে, আমার ইংরাজি জন্ম তারিখ কেউ খেয়াল করেনি। শুধু জন্ম দাত্রি মা মনে রেখেছে আমার জন্মের বাংলা তারিখ। প্রথম এই বাংলা জন্ম তারিখ লেখা হয় আমার ছোটবেলায় তোলা দুটি সাদাকালো ছবির ফ্রেমে। কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো পাশাপাশি করে দুটি ছবি, নিচে লেখা আমার নাম, জন্ম তারিখ, বার আর রাশি। “সঞ্জয় হুমায়ুন, ৬ই কার্ত্তিক, মঙ্গলবার, দিন গত রাত্রি ১০টা, কন্যা রাশি”

ফিরে আসি ইস্কুলের ঘটনায়। অনেক অনুরোধ করার পরে ইস্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে ভর্তি নিতে রাজি হল, কিন্তু একটা শর্ত। জন্ম প্রমান হিসাবে একটা affidavit করে জমা দিতে হবে। শর্ত অনুযায়ী তাই করা হলো, বাংলা তারিখ বসিয়ে একটা affidavit করা হল। তার পর নির্বিঘ্নে কেটে গেলো ৯টি বছর। আবার সমস্যা হল মাধ্যমিকের রেজিস্ট্রেশনের সময়। ইস্কুল কর্তৃপক্ষ affidavit হারিয়ে ফেলেছে, আবার নতুন affidavit করার নির্দেশ দিলেন, কিন্তু এবার কড়া করে বলে দিলেন যে ইংরাজি তারিখ বসিয়ে যেন affidavit করা হয়। বাড়ি শুদ্ধ লোকের মাথায় এবার আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এবার কি হবে? ইংরাজি তারিখ কোথায় পাবে? সময়টা তখন ২০০১,  তখন হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট নেই। হয়তো ইন্টারনেট কি জিনিশ আমিও জানতাম না। বাড়িতে এক ঘন কালো শোকের ছায়া নেমে এলো। সকলেই চিন্তিত, কি হবে এবার।

এত দিনে আমারা তখন গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এসেছি। সদ্য আমাদের পাড়া এবং এলাকা পঞ্চায়েত থেকে মিউনিসিপালিটি হয়েছে। কাকা ছুটলো পঞ্চায়েত আপিসে, যদি কিছু করা যায় সেই আশায়। ঈশ্বর এবার মুখ তুলে তাকালেন আমার দিকে, তবে সঙ্গে আবার একটু মিটি-মিটি হাসিও হাসলেন। পঞ্চায়েত থেকে মিউনিসিপালিটি হওয়ার সময় সব কাগজ পত্র, নথি পত্র পাল্টানোর কাজ চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচিত বেক্তি আমার কাকা কে একটা পরামর্শ দিলেন। উনি একটি পঞ্চায়েতের letter headএ কাচা জন্ম প্রমান পত্র লিখে দিলেন। কিন্তু সমস্যা বাঁধিয়ে ফেললেন ওই ইংরাজি তারিখে। আমার বয়স হিসাব করে উনি মন থেকে একটা তারিখ লিখে দিলেন খসড়া certificateএ, 4th march 19xx. ব্যাস, সেদিন থেকেই কাগজ কলমে আমার জন্ম তারিখ হয়ে গেলো। বাংলায় ৬ই কার্ত্তিক আর ইংরাজিতে 4th march. মাধ্যমিকের registration এ লেখা হয়ে গেলো 4th March. সেই সুত্রে, আমার রেশন কার্ডে, ভোটের কার্ডে, PAN কার্ডে এমন কি Aaadhar কার্ডেও এই তারিখ জন্মের মত জন্ম তারিখ হয়ে সেঁটে গেলো।

২০০৬, এদিকে ইন্টারনেটের জোয়ার উঠেছে, আমি তখন কলেজে। কলেজের নির্দেশে email বানাতে হবে। email বানাতে বানাতে হঠাৎ আমার মাথায় এলো, এই 4th march তো আমার আসল জন্ম তারিখ নয়!! শুরু হলো চিরুনি তল্লাশি। ইন্টারনেট তোলপাড় করে ফেললাম ৬ই কার্তিকে আমার জন্ম সালে ইংরাজি কোন তারিখ ছিল খুজতে। মন থেকে খুজলে ঈশ্বরের দেখা পাওয়া যায়, আর এটা তো শুধু মাত্র একটা তারিখ। কোন একটা ওয়েবসাইট বা ফোরামে ৬ই কার্ত্তিক আর আমার জন্ম সালের উল্লেখ ছিল, সঙ্গে ছিল ইংরাজি তারিখ আর বার। আমি তারিখ মাস বছর আর মঙ্গলবার মিলিয়ে নিলাম। সব ঠিক আছে, কোন সন্দেহ নেই যে 23 October ছিল ৬ই কার্ত্তিক। সেই থেকে আমি 23 Oct আর ৬ই কার্ত্তিক, এই দুদিই জন্মদিন হিসবে মনে রেখেছি। শুধু মাত্র কাগজ পত্রে এখনো বয়ে নিয়ে চলেছি সেই অজনা অচেনা 4th March কে।

৬ই কার্ত্তিক আর 23 October বেশ খুনসুটি করে প্রত্যেক বছর। কোন বার বাংলা আগে আর ইংলিশ পরে, তো কোন বার ইংলিশ আগে বাংলা পরে আসে। দুই বা একদিনের এদিক ওদিক হতেই থাকে প্রতি বছর।  Bong calendar নামক একটি এন্ড্রয়েড অ্যাপ আছে, এটিতেও আমি verify করে নিয়েছি, এই দুই তারিখ একই দিনে ছিল সে বছর। 2018 তে আজ 23 October, আগামি কাল ৬ই কার্ত্তিক, আবার আগামি কাল লক্ষ্মী পূজো। আমি ব্লগ লিখছি, ঈশ্বর আল্লাহ ভগবান হয়তো এখনো মিটিমিটি হাসছে, আমার লেখা দেখে। 🙂

আমার নিঃশব্দ কল্পনায় দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি, আমার জীবনের
স্মৃতি, ঘটনা, আমার চারপাশের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে লেখার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষেরই ঘন কালো মেঘে ডাকা কিছু মুহূর্ত থাকে, থাকে অনেক প্রিয় মুহূর্ত এবং একান্তই নিজস্ব কিছু ভাবনা, স্বপ্ন। প্রিয় মুহূর্ত গুলো ফিরে ফিরে আসুক, মেঘে ডাকা মুহূর্ত গুলো বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ুক। একান্ত নিজস্ব ভাবনা গুলো একদিন জীবন্ত হয়ে উঠবে সেই প্রতীক্ষাই থাকি।

অন্যান্য লেখা

Leave A Reply