কচুর বইমেলা ভ্রমণ © Uttiya Bhattacharya

0
Share it, if you like it

অবশেষে কচু ঠিক করলো যে ও বইমেলা যাবে । সবাই কলকাতা বইমেলা যাচ্ছে , কচু না গেলে প্রেস্টিজ থাকবে ? তাই পরের সোমবার যাওয়া ফিক্স করলো ও ।

এদিকে কচু এক কেলো করে রেখেছে । আমাদের কচু হলো ফেসবুক যোদ্ধা । মানে ওই ফেসবুক কবিদের লেখা কবিতায় গিয়ে “ দারুন হয়েছে দাদা, কবিতাবাসা ” ইত্যাদি কমেন্ট করে । কচু নিজের ঘরের দেওয়ালে কয়েকটা ইউনিক কমেন্ট লিখে রেখেছে । সেগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ইউজ করে । কয়েকটা তুলে দিলাম ।

1. আহা ! কি লিখলে দাদা ।
2. এটা সেরা দাদা । দাদা তুমি সেরা ।
3. আদরবাসা নিও ।
4. কবিতাবাসা
5. এই লেখাটার দরকার ছিলো দাদা ।
6. শেয়ার করতে পারি ?
7. আমি সত্যজিত রায়কে দেখিনি । তোমাকে দেখেছি দাদা ।
8. দাদা এটা আগুন ।
9. কি করে পারো গো তুমি ?
10. তোমার এই প্রেমের কবিতা পড়ে হাউহাউ করে কাঁদছি গো ।

স্বভাবতই অ্যাকটিভ লাইকার ও কমেন্টার হিসেবে কচু ফেবুকবি মহলে বেশ বিখ্যাত । ওর মতামতের বেশ একটা দাম আছে । এদিকে ও যে স্কুলে সহজ পাঠ, পাঠ্য আর রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমি ছাড়া প্রায় আর কিছুই পড়েনি সেটা কেবল আমরা স্কুলের বন্ধুরাই জানি ।
ইতিমধ্যে বইমেলার আগে-আগে ট্রেন্ড বেরোলো নতুন — বই লেখার ট্রেন্ড । মানে যতো জঘন্য বালবিচিই লেখো তুমি, হাজারদশেক টাকা ছাড়ো, আর গরম গরম কয়েকশো কপি কবিতার বই ছেপে গেলো । সাথে রংচঙে প্রচ্ছদ ফ্রি । দাম মাত্র 69 টাকা ।
কচুরও ইচ্ছে ছিলো বই ছাপবে । কিন্তু ওর গরীব বাপ বই ছাপানোর দাম দশ হাজার শুনে সেই যে বাড়ির সব টাকা ব্যাঙ্কের লকারে রেখে এলো , তারপর আর টাকা বের করলো না । বেচারা কচুর বই লেখার ইচ্ছেও অপূর্ণ থেকে গেলো।

তবে বাকি ফেবুকবিরা তো ছাপাচ্ছে ! বইমেলায় বই বেরোবে, সেটা ফলাও করে ফেবুতে জানাতে লাগলো ফেবুকবিরা । আর তাতে আরো অনেকের মতো কচুও গিয়ে কমেন্ট করতে লাগলো ।
— “ দাদা এই বইটা আমি নেবোই । ”
— “ দিদি সত্যি বলছি বইমেলা ঢুকে প্রথম কাজ হবে তোমার বইটা নেওয়া। ”
— “ উফফ, Can’t wait দাদা । তোমার কবিতার বইটা যে বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী একটা অবদান রাখবে সেটা এখনই বুঝতে পারছি । ”

এরকম অন্তত একশোটা ফেবুকবির একশোখানা পোস্টে একশোবার কমেন্ট করে কচু বলেছে যে তাদের বইটাই ও সবার আগে কিনবে ।
যাই হোক, সোমবার সন্ধ্যার দিকে বইমেলা ঢুকলো কচু । এদিকে পকেটে একশো টাকাই সম্বল । ওর কিপটে বাপ এর চেয়ে বেশি টাকা দেয়নি আর ।
বইমেলা ঢুকতেই চোখে পড়লো স্টল নম্বর 420 । এক বিখ্যাত ফেবু সেলেব কবি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে । কচু সেখানে গিয়ে হাসিহাসি মুখ করে বললো, “ দাদা চিনতে পারছো ? ”
ফেবুকবি চিনতে পারলো না । মনক্ষুন্ন হয়ে কচু বললো, “ আমি কচু গো দাদা । তোমার লেখায় কমেন্ট করি । ”
— ওওও, মানকচু ! এসো এসো ভাই । কেমন আছো বলো ?
— ভালো আছি দাদা । তুমি কেমন বলো ?
— ভালোই আছি । তা আমার বইটা নিতে এসেছিস তো ? ফেসবুকে তো কমেন্ট করে বলেছিলি নিবি । এই নে এই নে ।
— ইয়ে মানে… বাকি স্টলগুলো একটু…
— আরে নে তো । লজ্জা পাসনা । মাত্র আশি টাকা দাম । পড়ে দেখ । জীবন বদলে যাবে । আমার সেরা লেখাগুলো দিয়েছি এটায় ।

কচু বইখানা হাতে নিলো । পাতলা চটি বই । বেগুনী রংয়ের এমন এক প্রচ্ছদ যেটা কবিতার সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয় । বইটা খুলে প্রথম পাতা থেকে কয়েকটা কবিতা পড়তে শুরু করলো ও :

(১)
সিরিয়ার আমৃত্যু শিশু, ইজরায়েলি শান্তি
তুমি গড়িয়াহাটের ব্রা,আমি ছেঁড়া প্যান্টি ।
(২)
সাদা ভাল্লুকের লোমের মতো
তোমার পিঠের সেই তিল,
সেই তিল দেখে বান্টুর ন্যায়
লাফিয়ে উঠলো আমার দিল ।
(৩)
ভাগ্যিস তোমার পিরিয়ডস হয়,
তাই হয়েছি আমি ।
তোমার নগ্ন বুকে খেতে চাই
চুয়ান্ন কোটি হামি ।
(৪)
চকলেট দিতাম তোমায়, তুমি বানালে ব্যর্থ প্রেমিক ,
সিগারেটের ধোঁয়া খেয়ে আমি আজ ক্যালানে পথিক ।

আর পারলো না কচু । রেখে দিলো বইটা । ফেবুকবি দাদা আবার বলতে লাগলো, “ কি ভালো লাগলো তো ? এই বইটা আসলে এমন একটা কনসেপ্টে লিখেছি যেটা বাংলা সাহিত্যে আগে কখনো ভাবা হয়নি । সিরিয়ার যুদ্ধের সাথে ঘরোয়া প্রেমের খুঁটিনাটি মিষ্টি বিবরণ, বুঝলি তো ? নিয়ে নে । স্টক শেষ হওয়ার মুখে । আর বেশিক্ষন থাকবে না । ”
গজগজ করতে করতে বই হাতে বেরিয়ে এলো কচু । ল্যাওড়া এগুলো কবিতা ? এইসব ঝাঁটজ্বালানো কবিতার জন্য আশি টাকা চলে গেলো ।

এবার আর কচু পরের স্টলে গেলো না । পরের স্টলে আর একজন ফেবুকবি তার বই নিয়ে বসে । যদি নিজের বই গছিয়ে দেয় ? তাই ওদিকে আর গেলোনা ও । ফেসবুকে কমেন্ট করতে পয়সা লাগেনা, উল্টে ফ্রি হিসেবে পরিচিতি বাড়ে । বইমেলায় তার কিছুই নেই । খালি টাকা খরচ করে জঘন্য সব বই কেনা । ফুটেজও খাওয়া যায়না । যাচ্ছেতাই জায়গা একটা !!
স্টলগুলো থেকে দূরে দূরে থাকতে লাগলো কচু । বলা তো যায়না কখন কোন্ ফেবুকবি এসে বই গছিয়ে দিয়ে যাবে । স্টলে স্টলে কোনো না কোনো ফেবুকবি । এদের কারুর পোস্টে হাজার লাইক পড়ে, কারুর আটশো । কেউ কেউ উঠতি পাঁচশোও আছে । সবাই প্রায় কচুর চেনা ।
কচুর ফ্রেন্ডলিস্টে এক চোদনা আছে । সে এসব কবিতা লেখে না , বরং এসব লেখার কট্টর বিরোধী । সে কদিন আগে বলেছিলো যে বইমেলায় পাঠক কম, লেখক বেশি । সারাবছর সেই চোদনাকে খিস্তি মেরে এলেও আজ তার কথা না মেনে পারলো না কচু ।

তবে লিটল ম্যাগাজিন কর্নারের কাছে এসে কচু ধরা পড়ে গেলো । কোথা থেকে একটা কম বয়সী ছেলে ওকে দেখতে পেয়ে ছুটে এলো , “ আরে কচুদা, তুমি এখানে ? ওহ বুঝেছি । আমাদের লিটল ম্যাগাজিনটা নিয়ে আয় রে । দাদা শুধু আমাদের ম্যাগাজিনটা নেবে বলে এতোদূর জার্নি করে এসেছে । ”
কচু আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই ম্যাগাজিন এসে গেলো । ছেলেটা আবার বললো, “ এই নাও দাদা । লাস্ট কপিই পড়ে ছিলো । শুধু তোমার জন্য রেখে দিয়েছিলাম । আমি তো জানতামই তুমি বইমেলা আসবে আর আমাদের ম্যাগাজিন নেবে না এটা হতেই পারেনা । ”
— ইয়ে.. মানে আমার কাছে টাকা বেশি…
— আরে টাকার কথা কি বলছো দাদা ? আমরা আছি তো ? মাত্র পনেরো টাকা দাম । তোমার কাছে কিছুই না । পরেরবার তোমার একটা কবিতা চাই কিন্তু । না-টা শুনবো না ।
— আচ্ছা ভাই, দেখবো ।
— আরে আপাতত আমাদের ম্যাগাজিনটা দেখো । খুলে দেখোই না । আমাদের টিম ইনভেস্টিগেট করে জানতে পেরেছে নেতাজি বেঁচে আছে । সেই নেতাজির বর্তমান অ্যাড্রেস থেকে শাহিদ কাপুরের মেয়ের জন্মতিথি … সব দেওয়া আছে । সেফ আলি খানের লেখা উর্দু কবিতাও আছে । আর শ্রীজাতর সনেট । আরো আছে । একটা ছোটোগল্প , নাম হলো ‘ পানু দেখার আগে ’ । চোখে জল এনে দেওয়া লেখা গো দাদা । আর আছে সেই…

পনেরো টাকা দিয়ে ম্যাগাজিন নিয়ে পালিয়ে বাঁচলো কচু । নাহ, আর পাঁচটাকা বাকি আছে । এই ডাকাত গুলো সেটুকু নিয়ে কোনো উপন্যাস ধরিয়ে দেওয়ার আগে মানেমানে কেটে পড়াই উচিত। এটা বইমেলা না, জঘন্য-সাহিত্য মেলা ।

তবে শেষরক্ষা হলো না । গেটে বেরোনোর মুখে আর এক পপুলার ফেবু কবিনীর সাথে দেখা হয়ে গেলো কচুর । কবিনী… মানে মেয়ে কবি । তিনিও বই লিখে বের করেছেন স্বাভাবিক ভাবেই । এই বাজারে পিছিয়ে থাকা যায় নাকি ? কবিদিদি বইমেলাতেও বিয়েবাড়ির সাজ মেরে ঢাকাই শাড়ি পরে এসেছেন । সাথে পাঁচ ইঞ্চি ময়দার প্রলেপ ।
কচুকে দেখে কবিনী বললেন, “ নমস্কার মানকচুবাবু । আপনি তো আমার পোস্টের বেস্ট কমেন্টার । খবর ভালো তো ? ”
— হ্যাঁ মানে ভালোই আর কি ।
— বেশ বেশ । চলে যাচ্ছেন বুঝি ?
— হ্যাঁ বেরোবো এবার ।
— আচ্ছা । আলাপ হয়ে ভালো লাগলো ।

কচু একটু অবাক হলো । কই ইনি তো বই গছিয়ে দিলেননা ! বই কেনার ইঙ্গিতও করলেননা ! তারমানে সবাই হয়তো এক হয়না । ছি ছি, কচু এতোক্ষন এই ফেবুকবি গোষ্ঠীকে কি গালাগালিই না দিচ্ছিলো !
লাজুক মুখে একগাল হাসি নিয়ে কচু ফিরে এলো আবার । ফেবুকবিনীকে গিয়ে বললো, “ দিদি একটা সেলফি তুলি তোমার সাথে ? ”
— নিশ্চয়ই ।

কচু মোবাইল বের করে ক্যামেরা খুলে মুখ বেঁকিয়ে দাঁড়ালো । হঠাৎ কবিনীদিদি বলে উঠলেন, “ এই দাঁড়াও দাঁড়াও, ফ্রেমটা ঠিক জমছে না । কিছু একটা মিসিং মনে হচ্ছেনা ? ”
কচু থমকালো, “ কি মিসিং গো ? ”
— দাঁড়া ।

বলে কবিদিদি স্টল থেকে নিজের একটা বই নিয়ে সামনের পেজে পেন দিয়ে খসখস করে লিখলো, “ কচুকে, আমার উপহার । ”
তারপর কচুকে বইটা দিয়ে বললো, “ এই পাতাটা খুলে দেখিয়ে সেলফিটা তোল । এবার জমকালো ব্যপার হবে তাহলে । ”

হাঁ হয়ে গেলো কচু । সেলফি তুলে বললো, “ এই নাও বইটা। ”
— আরে বইটা তোর রে । তোর জন্য । মাত্র দুশো কুড়ি টাকা দাম ।
— কতোওওওওও ?
— দুশো কুড়ি রে । তোর জন্য স্পেশাল ডিসকাউন্ট । তুই দুশো দশ দিস ।
— কিন্তু আমি তো কিনবো বলিন…
— এই বইটার থিম বইমেলার বাকি বইগুলোর থেকে একদম আলাদা । ভালোবাসা আর যৌনতার সাথে গ্লোবালাইজেশানকে মিশিয়ে দিয়েছি । প্রকাশক বলেছে এটাই নাকি বইমেলার সেরা কাজ । তুই পড়ে রিভিউ দিস কিন্তু । আরহ বাড়ি ফিরে সেলফিটা ফেসবুকে আপলোড করিস ।

বইটা খুললো কচু । প্রথম কবিতার শুরুর দুলাইন :

“ মিশরের মমি দেখে তোমায় দেবো শর্ত,
সফল হলে পাবে আমার গোপন গর্ত । ”

মনে মনে খিস্তি করতে করতে পরের পাতা ওল্টালো ও । প্রথম দুলাইন :

“ কলকাতার সন্ধ্যে আর ফরাসী চুমুর যন্ত্র ,
প্রেমিক তুমি নাভি ছিঁড়ে ছুঁয়ো আমার অন্ত্র ।”

কচু বইটা বন্ধ করে কবিদিদির হাতে দিয়ে বললো, “ সত্যি সেরা লিখেছো দিদি । পড়তে পড়তে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিলো । লাস্ট লাইনটা সেরা, উফফ ! দাঁড়াও আমি আমার কটা বন্ধুকে ডেকে নিয়ে আসি । ওরাও কিনবে বলছিলো বইটা । এই অমূল্য রত্ন সবারই পড়া উচিত । দুমিনিটে আসছি আমি । ”
যথারীতি কচু ফেরেনি । মেলামুখোই হয়নি বাকি কদিন । সেই কবিদিদি এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা ভুলতে না পেরে পরের একসপ্তাহ রোজ কুড়ির বদলে পঁচিশটা করে দুঃখের কবিতা লিখতে লাগলো ।

এখন কচু বাড়ি বসে কবিতা লেখা প্র্যাকটিস করে । পরের বছর বইমেলায় গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে ওর একটা কবিতার বই বেরোবে । দশহাজার টাকা জমাতেও লেগে গেছে । সেদিন ওর বাড়ি গিয়ে দেখলাম মুখ গুঁজে লিখছে :

গরমকালে মরছে কতো রয়্যাল বেঙ্গল আর চিতা,
আমার স্বপ্নদোষে উঁকি মারে তোমার ব্রায়ের ফিতা ।

Source: © Uttiya Bhattacharya

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

অন্যান্য লেখা

Leave A Reply