সেকালের একালের নিমন্ত্রণ বাড়ির কথা★খাই খাই(৫)

0
লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন
  • 71
    Shares

আজকে বলবো নিমন্ত্রণ বাড়ির একালের কথা। এটা নিয়ে কিছু বলতে গেলে পুরনো দিন বা সেকালের কথা তো চলে আসবেই। এখন বাড়িতে কোন সামাজিক আচার অনুষ্ঠান হলে লোকজন শুধু একটা ফোন করে নিমন্ত্রণ সারে। কার্ড আত্মীয়ের বাড়ির ঠিকানাতে পাঠিয়ে ফোনটা করে। খুব কাছাকাছি যারা আছে তাদের বাড়িতে গিয়ে দশ মিনিট বসে কার্ড হাতে দিয়ে দায় সারে অন্য আত্মীয়ের বাড়িতে যেতে হবে এই অজুহাতে। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি কেউ তার বাড়ির অনুষ্ঠানের জন্য নিমন্ত্রণ করতে এলে সবিস্তারে সম্যক ব্যাপারে আলোচনা করতো। ভালো মন্দ পরামর্শ চাইতো। নিমন্ত্রণ করতে এসে দুদিন কাটিয়ে যেতো। এখন কারোর এতো সময় নেই। সেই আন্তরিকতার খুব অভাব। নিমন্ত্রণ করতে এলেই আগে উভয় পক্ষই মিস্টি খাওয়াত, যেহেতু আনন্দ অনুষ্ঠান।

এবার বলি মূল অনুষ্ঠানের কথা। আগেকার দিনে আত্মীয় স্বজন এলে তারা কয়েক দিন কাটিয়ে যেতো।এখন তো আবার সবাই খুব ব্যস্ত। তাই অনুষ্ঠানের দিন কিছু সময় উপস্থিত হয়ে উপহার দেওয়ার দায় সেরে কোনমতে খেয়ে বা না খেয়ে চলে গেল। আর খাওয়া দাওয়ার কথা তো বলতেই হবে।  আগে ছিল ডেকরেটরদের টেবিল চেয়ারে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। সেই ভাঁজ করা চেয়ারে বসার নির্দিষ্ট কায়দা ছিল। আর টেবিলের কথা তো সবাই জানেন। দুদিকে কাঠের স্ট্যান্ড। সেটাকে খুলে ওপরে কাঠের লম্বা তক্তা। একটু অসাবধান হলেই সব নিয়ে পড়ে যাওয়া। এক সাথে সারি দিয়ে বসে খাওয়া। এ-তার পছন্দের লোকের জন্য পাশে জায়গা রেখে দেওয়া।

এখন তো বসার ব্যবস্থাটাই উঠে যাচ্ছে প্রায়। ব্যুফে তে বসে খেলে আবার অন্য জনের কাছে হেরে যাওয়ার প্রশ্ন। সবাই দাঁড়িয়ে খাবে। ঘুরে ঘুরে গল্প করতে করতে খাওয়া। ভারী প্লেট চামচ হাতে, ধাক্কাধাক্কি এড়িয়ে কতোটা কসরত যে করতে হয় সে যে এমন নিমন্ত্রণ খায় সেই জানে।

ছোটবেলায় দেখেছি বাড়ির কচিকাঁচাদের জল, লেবু, লবন পরিবেশন করতে দেওয়া হতো। এখন নিমন্ত্রণ বাড়িতে জল থাকে। কিন্তু লেবু লবন তেমন চোখে পড়ে কি? ক্যাটারারের ছেলেরা নির্দিষ্ট পোষাক পরে অপেক্ষা করে। আমাকে আপনাকেই যেতে হবে তাদের কাছে নিজের উদরপূর্তির জন্য। আগেকার দিনে পরিবেশন করা একটা আনন্দের ব্যাপার ছিল। এখন তো বাড়ির লোকজনকে এসব দায়িত্ব নিতে হয় না। নিজের দায়িত্বে খাও। হয়ে গেলে বিদায় নাও। কেউ জিজ্ঞাসা করবে না কোন রান্নাটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে। আগে এরকম হতো না। তখন ছিল খেয়ে খাইয়ে আনন্দ পাওয়া। এখন শুধুই দেখনদারি আর দায় সারা।

খাবারের পদের কথা আর কি বলি। সবাই জানেন তবুও খাওয়া দাওয়ার গল্প যখন একটু আধটু উল্লেখ তো করতেই হবে। শুরু হবে ফিস ফ্রাই বা মাছ ভাজা দিয়ে। তার আবার কতো নাম। ফিস ওরলি, বাটার ফিস ফ্রাই, ফিস কাটলেট এরকমই সব। তার সাথে দেয় বুড়ো শশা আর কেটে রাখা পেঁয়াজ। আবার স্যস্ বা কাসুন্দি। আগের সময়ের ভেজিটেবল চপ উধাও। রাধা বল্লভী, লুচি এসব এখন ব্যাক ডেটেড। তার বদলে এসেছে বেবি নান। ওরে বাবা! ঠান্ডা হয়ে গেলে তো জুতোর চামরা। ঘি ভাত নেই। এখন পি রাইস, জিরা রাইস, বিরিয়ানি। মাছ মাংসের নানা লোভনীয় পদ কিন্তু এক পিসের বেশী খেতে পারা যাবেনা। এমনই গুরুপাক রান্না। কোনরকম তরকারি এখন নিমন্ত্রণ বাড়িতে খাওয়ায় না। ব্যাস হয়ে গেল। এবার প্লেট নামিয়ে দিন। আবার ছোট প্লেট নিন। এবার পাবেন চাটনি আর মিষ্টি। ছোটবেলায় দেখেছি নিমন্ত্রণ বাড়িতে রসগোল্লা খাওয়ার প্রায় প্রতিযোগীতা চলতো। এখন দুতিন রকমের মিষ্টি অথচ এক দুটোর বেশি খাওয়া যায় না। অনেকেই পাঁপর দিয়ে চাটনি খেতে পছন্দ করেন। অথচ এখন পাঁপর গুলো নানারকম ছোট আকৃতির।

বছর খানেক আগে এক নিমন্ত্রণ বাড়িতে মাংসের রোগন জ্যুস করেছে। দু একজন বলাবলি করছে। এটা দারুণ খেতেই হবে, আরে ট্রাই তো কর? ইত্যাদি ইত্যাদি। কত্তা এসে বললেন ‘খেয়ো না, তোমার পছন্দ হবে না’। গিয়ে দেখি, সত্যিই তাই। কাশ্মীরে খেয়েছি রোগন জ্যুস। ভেড়ার পায়ের মাংস দিয়ে তৈরি। সেই স্বাদ, গন্ধ কিছুই পেলাম না। মাস খানেক আগে এক নিমন্ত্রণ বাড়িতে খেতে গিযে কত্তা বাবু তার পছন্দের সাদা লখনউ চিকনের কাজ করা পাঞ্জাবির হাতায় হলুদ দাগ লাগিয়ে আনলেন। যেখানে দাগ লেগেছে সেখানে অন্য কেউ এঁটো হাতে ঠেলাঠেলির মধ্যে ঐ দাগ লাগিয়েছে। যা হয়– ছোট জায়গায় ব্যুফেতে খাওয়া। কেউ অনিচ্ছাকৃত ভুল করে ফেলেছে। আমি তাড়াতাড়ি করে সাদা টুথ পেস্ট কিছুটা নিয়ে ওই জায়গায় লাগিয়ে দিলাম কিছুক্ষনের জন্য। তারপর ঠান্ডা জলে ধুতেই দাগ মিলিয়ে গেলো। কত্তার এক গাল হাসি বেরলো তখন। নিমন্ত্রণ বাড়ির একাল সেকাল নিয়ে অনেক কথাই বললাম।
(চলবে।)
🍇🍉🍎

খুব সাধারণ আমি আর পাঁচটা সাধারণ মেয়েদের মতোই। ছোট্ট পরিবার ও সংসার নিয়েই থাকি সারাদিন। শুধু যখন খুব একা হয়ে যাই তখন আমার আমিটা আমাকে লিখতে বলে আমার কথা, আমার চারপাশে নানা লোকজনদের কথা। অন্যায় দেখে অনেকের মতোই গর্জে ওঠে আমার মন। তখনও এই লেখা’ই হয়ে ওঠে আমার প্রতিবাদের ভাষা। আমরা পরিবেশ সংসার সমাজ দেশ দশ সবকিছু বদলাবার কথা বলি। সহমর্মিতার কথা বলি। সবচেয়ে আগে বদলাই যেন নিজেকে। মানবিকতা বোধটা যেন হারিয়ে না ফেলি।।
mouchakraborty1971@gmail.com


লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন
  • 71
    Shares

★আপনার মূল্যবান মন্তব্য দিয়ে আমাদের পথ চলা ধারাকে অব্যাহত রাখুন★

★ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে কমেন্ট করুন★

Leave A Reply