কাঠি বরফ

0
Share it, if you like it

জৈষ্ঠের দহন আর সহ্য হচ্ছে না- এমন গরমে মনে হয়
রাস্তার পিচও গলে গলে পায়ে জড়িয়ে যাবে- অথচ ভরদুপুরে আমার হাঁটাহাঁটি থামছে না।
এসেছিলাম নিজের কাজে,পাসেই একটা ইঁট কারখানা (ভাঁটা) দেখলাম। এরকম কাঠফাটা রৌদ্রে নাকি ইঁটের শেফ খুব ভালো হয়, বেশ ইন্টারেস্টিং এই ইঁটকাটা শিল্প। বালি এবং ঘামের মিশ্রিত প্রেমের অনুশীলনে একেকটা সন্তানের মত জন্ম দেয় চৌকোণা অবয়ব। এরকম তপ্ত দুপুরে সেই আর্ট একটু দেখতে বেরিয়েছি।

হ্যাঁ ‘এরকম’ শিল্পমনষ্কতা আমার একটু আছে বৈকি! ইঁট ভাটায় ঢোকার আগেই দেখি একটু দূরে আইস্ক্রিমের গাড়ি। ভাবলাম খাবো, শালা আজকে গলা ভিজিয়ে সুখ নেব। কিন্তু সমস্যা একটাই- এখনকার আইস্ক্রিম তো আইস্ক্রিম, মানে সেটা তো আর বরফ না, ছোট বেলায় এরকম রঙিন বরফ ফেরি করে বেড়াত আর সুর করে হাঁক পাড়ত আইসক্রি…ম!এসব অতিতের কথা মনে পড়ে- সাইকেলের পিছনে ছুট্টে যাচ্ছি কিছুদুর গিয়ে মুখে কিছু না বলে হাত তুলে একটাকা দুইটাকার কয়েন দিলাম আর বিনিময়ে বাক্সের ভীতর পলিথিন পেপারের মধ্যে থেকে হীম’বাষ্প ওড়া সেই বরফ, কাঠি বরফ- আহা! কিন্তু এখন আর তেমন নেই তাই গলা ভেজেনা, গলা ভরায়।
যাইহোক আমি বেশ কিছুটা দূরে থাকায় ইশারায় ডাকার চেষ্টা করলাম, আমায় একা দেখে আইস্ক্রিম ওয়ালা ইতস্তত করছে, এই গরমে সেও হাঁফিয়ে উঠেছে মাত্র একটাই তো বিক্রি হবে আসবে কিনা ভাবছে। আমার ইশারা আর আগ্রহ দেখে না এসে থাকতে পারলো না। এবার আমি চাইলাম, সেই বরফ-
– ভাই বরফ দাও তো একটা।
-কি বরফ? আইস্ক্রিম? বাটি না কাপ?
-ধুর ভাই কাপ বাটি কিছুই না, আমি বরফ খাবো কাঠি দেয়া রঙিন বরফ! ছোট বেলায় চুষে চুষে খেতাম গলা ভিজিয়ে, সেই বরফ। আছে ?
-নেই,,,
-নেই মানে?
একে তো এই রৌদ্রে তাকে এতদূর টেনে আনলাম তার উপরে এসব কথা, নিশ্চয় তার ভালো লাগছে না, বিরক্তি নিয়ে বলল
-ভাই ওইগুলো আর চলেনা। সবাই এখন ভালো মাল খায়। দামি মাল.., ওই মালের খোঁজ হবে আগে বুঝতে পারলে আমি আসতাম না। মাল জিনিসটা যে কত রকম হয় সেটা বাঙালীরা ছাড়া আর কেউ জানেনা।
-আরে ভাই তোমার কাছে কাঠি দেয়া বরফ আছে কি নাই? যদি থাকে তবে দাও ভাই- ওসব মাল ফাল খাবোনা আমি মাল খোর নই- বরফ খাবো বলতে পারো বরফ খোর।
কিছুটা অবাক হোলো লোকটা, এত কিপটে মানুষ এখনো আছে ভেবে বোধহয় একটু বিরক্তও
-কাঠি বরফ আছে তবে সেটা ‘কাঠিবার’ শক্ত। কিন্তু পাঁচটাকা পিস, আগেই বলে দিলাম কম হবে না।
-ওকে কাঠি ‘বার’ হোক আর কাঠি’মার’ হোক আমাকে সেটাই দাও ভাই। এটাই তো খুঁজছিলাম,,
যদিও সেটা ছোট্টোবেলার সেই বরফ নয়- অগত্যা কি আর করা, মানে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত। অতঃপর
আমি কাঠি ‘মার’ খাচ্ছিলাম…
হটাৎ প্রচন্ড চিৎকারে একটি বাচ্চা মেয়ের কান্নার আওয়াজ। ওর মা খুব মারছে ওকে, কেন?– টাকা চুরি। ভাবলাম ঠিক করছে, এইটুকু পিচ্চি আর চুরি? এখনকার দিন কাল খুব খারাপ তার উপরে এসব ছোটলোকের বাচ্চারা চোর হবে না তো কি!
বুকটা একবার ছ্যাঁত করে উঠলো, যখনি শুনলাম চুরির কারন- মায়ের জমানো টাকা ছিল ঔষধের জন্য। কিন্তু পিচ্চি মেয়েটা একটা আইস্ক্রিম খাবে তাই এই কাজ করেছে। আর এখন কি মারটাই খেয়ে যাচ্ছে- হায়রে দারিদ্র্য! আদুল গালে এক একটা থাপ্পড় পড়ছে আর সে চিৎকার করছে…আঙুলের ছাপ লাল হয়ে আছে দুই গালে-
ভাবছি থাপ্পড় গুলো খাচ্ছে কে, পিচ্চি? আমি, আপনি না সমাজ! কে?
যাই়হোক আমার গলা ভেজা বন্ধ হয়ে এলো, গলাটা কেমন যেন আটকে আসছে। ধীরে ধীরে এগুলাম- থামালাম উদ্দাম প্রহার। পিচ্চি ফুঁপিয়ে যাচ্ছে… মা দমকা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ দুটি মুছে মুখে কাপড় ঢেকে চলে গেল, নিশ্চই কোন এক করুন কাহিনী কে ঢেকে। যে কাহিনী কেউ যানেনা, এভাবে তারা ঢেকেই রাখে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম টাকা চুরি করেছিস কেন? উত্তরটা যে আমার হাতেই ছিল আমি খেয়াল করলাম ওর চোখ দেখে- ভেজা দুটি চোখ ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে আমার হাতে ধরা আইসক্রিমের পানে.,,ব্যাপারটা বুঝতেই নিজেকে চার অক্ষরের বাংলা বললাম মনে মনে।
আইস্ক্রিম ওয়ালাকে ডাক দিলাম-
-কতো দামের আইস্ক্রিম আছে তোমার?এই পিচ্চি কে দাও,
-সে আবারো অবাক হলো, কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকায় এবং রেগেমেগে–
-ভাই একটু আগে কমা দামের বরফ খুজ্জিলেন আর এখন এসব কি করেন? ওর মা কি এই পয়সা দেবে? আপনি যানেন না, এই করে ছুঁড়িটা রোজ ঝগড়া করে আর মার খায়। আইস্ক্রিম দিলেই স্কুল যাবে, না দিলে যাবেইনা।
-অত কথা শুনতে চেয়েছি? তোমায় যা বললাম তাই কর, ওকে দুটি বাটি আইস্ক্রিম দাও…
‘বরফ’ওয়ালার অবাক হওয়া থামেনি
– হ্যাঁ দিচ্ছি ভাই,কিন্তু জানতে পারি দুটি কেন?
-একটা আমার গিফ্ট আর একটা আমাদের গিফট।
দুটো ‘বাটি ‘পেয়ে তার কিভাবে তাকিয়ে দেখা সে আইস্ক্রিমের দিকে! আমিও অবাক হলাম। কোন বস্তুর প্রতি কোন প্রাণীর এই প্রকার তাকানো যে কত অপরূপ দৃশ্য তা ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, কোন বিজ্ঞানিরও ক্ষমতা নেই তা কোন সমিকরণে বাঁধার। যদিও
ওর তাকানো দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিলো আমার। শৈশবের কিছু স্মৃতি বুকটা ভারী করে দিচ্ছিল।
-ওই খা রে, খেয়ে নে- দুটোই তোর।
একেবারে গম্ভীর মুখ করে সে তাকালো- যেন জানতে চাইছিল এত দেরি করে আসতে হয়! আমি মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নিলাম…
চোখ দুটো তার ভিজে তখনো, পাতার নিচে দৃষ্টিকটু অশ্রুচিত্র।
এরপর অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটনের মতো ছোট্ট একটা ফোকলা হাসি! সামনের দুটো দাত নেই, কি যে মিষ্টি! এটা বোধহয় আমার গিফট! পৃথিবীর যে কোন মানুষ যে কোন পরিস্থিতিতে যদি সেই হাসি দেখে তবে তার মন ভালো হবেই হবে। ততক্ষনে ইট ভাটার আরো কটা বাচ্চা-কাচ্চা যোগাড় হয়েছে। পালাই কোথা…
-ও আইস্ক্রিম ভাই সবাইকে বাটি (আইস্ক্রিম) দাও, আর আমাকে আরেকটা কাঠি(বরফ) দাও।
পিচ্চি গুলো খুব খুশি তখন…সবাই মিলে খাচ্ছি– ওরা ‘বাটি’ আর আমি ‘কাঠি’, মানে ওরা আইসক্রিম আর আমি বরফ। পেলাম আবার সেই সুখ! মনের সাথে সাথে গরমে গলাটাও ভিজে গেল। চোখটা ভিজেছিল কিনা জানিনা, কিংবা মনে নেই…ওসব মনে রাখা পাপ!

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

Appy Hans Hossen

Ami ke…? ami janina., ashole ‘ami’ kew na, amar jibonta dom deya ghorir moto cholche matro… jokhon theme jabe…!!! vabo to tokhon ki ami r ami(man) thakbo…? tokhon amake keu nam dhore dakbe ki…??. haha… tai bondhu, ami keu na… kodin age chilam na prithibite., kodin poreo thakbo na., majhe shudhu kichudin ei vubone ‘ami’r vumika palon…

Appy Hans Hossen
Mobile phones: 085380 12445
Address: Barasat, India

অন্যান্য লেখা

Leave A Reply