ইফতার পার্টি

0
Share it, if you like it

ইফতার পার্টি-ইফতার পার্টি, বিকেল হতে না হতেই বাচ্চা মেয়েটি বলতে লাগল মা মা -ইফতার পার্টি!
-মা(একটু অবাক হয়ে) কিরে পার্টির থেকে ইফতারি দেয় নাকি, তবে খুব ভালো হয় তো।
-হি হি হি… কী বোকা! আজকে পাসের চাচার বাড়ি ইফতার পার্টি। অনেক লোক খাবে। প্যান্ডেল করে সাজিয়েছে উঠোন।
মা- মা জানো! ওরা না কত্ত কত ফল এনেছে- আপেল, বেদানা, খেজুর, পেয়ারা, শসা, আঙুর । অনেক মিষ্টি- অনেক রকম চপ-চাপাটি ভাজা আরো কতো কি। আবার বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে! কারো ঢোকার অধিকার নেই অনেক নামি দামি মেহমান আসবে ।

-উফ কি মুশকিল ওরা ধনি মানুষ, অনেক নামি দামি মেহমান ওদের ইফতারি দেখলে হবে? তোর বাপের কি জমিদারী আছে, যে এসব আমায় শোনাচ্ছিস, যা ভাগ! তোকে যা বললাম তাই কর কল থেকে এক জগ পানি নিয়ে আয় সারাদিনের পর ঠান্ডা পানি একটু খেলে গলাটা শান্তি পায়! এক্ষুনি নিয়ে আয় সময় হয়ে এলো- তোর আব্বু ফিরবে।
পিচ্চিমেয়েটা উচ্ছ্বল থাকে সারাদিন, অনেক্ষন থেকে অপেক্ষায় আছে, কলের জল এনেই দেখে ঝুপড়ী ঘেরা বাড়ির সামনে আব্বুর রিক্সা বাঁধা। রোজার মাসে সবাই সবার বাড়িতে কিছু ভালো-মন্দ আনার চেষ্টা করে, স্বাভাবিক ভাবে আশায় বুক বেঁধে ছুটে এলো টুসি।
সন্ধ্যের আজানের আর দেরি নেই-
ওদিকে টুসির মা কিছু মুড়ি, সিদ্ধছোলা, আর চালের আটার হালকা পায়েস করে ইফতারি রেডি করছে,
-আব্বু আব্বু আমি আপেল খাবো। আব্বু আমায় একটা আপেল এনে দেবা! আমি খাবো, আব্বু আমায় আপেল আর লেবু এনে দাও আঙুর এনে দাও., রোজা রাখলে এমন হয় বড় মানুষেরও ভালো কিছু দেখলেই খেতে ইচ্ছে হয়, আর সে তো বাচ্চা একের পর এক বায়না ধরছিল টুসি।

(সারাদিন রিক্সা টেনে রোজা রেখে আর পারছিলনা সাগির মিঞা। তারপর যা রোজকার হলো প্রায় পুরোটাই গেছে বুড়ি মায়ের ঔষধ আর রিক্সা সারাই করতে আজ হাত ছিল পুরই খালি। একটু বাজার করবে, ইফতার কিনবে সে আর হয়নি।)
-এখন না। আরেকদিন এনে দেব, কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে সগির এখন চুপ কর ঘ্যানঘ্যান করা এসময় ভাল্লাগেনা । আসলে মেয়ের দাবী যে অবান্তর নয় তা পিতা জানে কিন্তু নিরুপায় মেয়ের আবদারের সামনে অপ্রস্তুত সে, তার মুখের দিকে তাকাতে পারছেনা।

-না না, আমি জানিনা- তুমি আমায় আপেল এনে দেবে কিনা বল…ফল এনে দেবে কিনা বলো…(নাছোড় মেয়ে বায়না করেই যাচ্ছে, আর চিৎকার করছে…না না.. আমার আপেল চাই, আমার ফল চাই, আমি ইফতার খাবো। )
-বাঁ হাত দিয়ে সজোরে একটা চড় কসিয়ে দিল সগির, আছাড় খেয়ে মায়ের কোলে গিয়ে পড়লো ছোট্ট মেয়েটা।
আর কিছু বলতে হয় নি, শুধু মায়ের কাছে মুখগোঁজ করে ফোঁপাচ্ছিল। ‘উচিৎ শিক্ষা’ এমনই একটা জিনিষ যে এতটুকু মেয়েও বুঝে যায় তাদের প্রত্যাশার সীমারেখা।
-মেয়েটা সারাদিন রোজা রেখে একটা বায়না করেছে কিনা -তাতে মুরদ হয়না আবার এভাবে মারলে? কইফিয়েত চাইল সগিরের স্ত্রী, সগির চাইল নিয়তির কাছে…
সারারাত কিছুই খেলোনা মেয়ে, খেলোনা মা বাবাও।

রাতে সগির নামাজে দোয়া চাইল নিজের অপারগতা প্রকাশ করে- হে খোদা রহমতের মাস এই রমজান, বর্কতের মাস, ক্ষমার মাস। আমাকে ক্ষমা করো… আর রহম করো আমার পরিবারের উপর, আমি আর কতো চেষ্টা করতে পারি! আমাকে ধৈর্য দাও…ক্ষমতা দাও দুপয়সা রোজগার করার।
সকাল বেলা রিক্সা নিয়ে আর একবুক আশা নিয়ে বের হলো সগির- প্রচণ্ড পরিশ্রমে ভাড়াও পেল।
বিকেলে বাজারে গেল। ফলের দোকান দেখে উদগ্রীব সগিরের চোখ। সোজা গিয়ে কয়টা টকটকা লাল আপেল নিল; সঙ্গে কিছু আঙুর, আর শসা, খেজুর।
বিকেলে ঠিক ইফতারের আগে সগির ঘরে ফিরল,
-মা…। মা কই আমার, দেখ আমি তোর জন্যে কি এনেছি…মা
ছুপ করে গাল ফুলিয়ে গুমরে আছে টুসি।সারাদিন কারো সাথে কথা বলেনি।
-মা.., রাগ করেছিস আমার মা। আমি খুব খারাপ, না মা? দেখ তোর জন্যে লাল আপেল আর ফল এনেছি।
গুমরে এককোণে দাঁড়িয়ে আছে ফোলা ফোলা টুকটুকে মুখের টুসি।
টুসির মা বলে-
-এই মেয়ে! কালতো খুব ইফতার পার্টি ইফতার পার্টি করছিলি। আরে বোকা ওরা হলো বড়লোক, আমরা হলাম গরিব। আমদের ইফতার পার্টি হয়না… তোর আব্বু এত কষ্ট করে এনেছে, যা মা- আব্বুর কাছে যা,,
টুসি আব্বুর দিকে মুখ তুলে চায়। আবার গাল ফুলিয়ে মুখ নিচু করে থাকে, বোঝা যায় তার অভিমান এতটুকু কমেনি,
-আয় মা, কাল খুব ভুল করে ফেলেছিলাম মা। একে তো কিছুই আনতে পারিনি, আবার তোর গায় হাত দিলাম। আজকে তুই আমায় যা বলবি আমি শুনব। দরকার হলে আজকে তুই আমায় চড় মেরে শোধ তুলে নিবি, আয় মা.. আমায় মার…মেয়ের হাতের নাগালে হাঁটু মুড়ে বসে সগির মিঞা চোখ বন্ধ করে গাল পেতে আছে সে, দু হাতে ভালবাসার থলি-
গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে টুসি… বুকে জড়িয়ে ধরে আব্বুকে। দুই গালে দুটো চুমা খেতেই- হাঁও-মাও করে কেঁদে ফেলে সগির। অনেক্ষন বুকে জড়িয়ে রাখে। বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। কচি হাতে পিতার মুখ মুছে দেয় টুসি।
ছগিরের স্ত্রী কাপড়ে মুখ গুঁজে থাকে।চোখদুটি ভেসে যায় খালি…”
একটু ভাবুন। কত পরিবার এই পবিত্র রমজান মাস এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছে।আর আমরা কি করছি? ইফতার পার্টি! ক্ষতি নেই, পার্টি দিতে কেও নিষেধ করেনি।

তবুও কি আসপাসে একটু খেয়াল
করা উচিৎ নয় আমাদের, এরকম কত টুসি আর টুসির পরিবার এমন ভাবে কাটিয়ে দেয় এই পুরো রমজান। এরজন্যে যদি মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের কইফিয়েত চান? কি জবাব দেবো তার কাছে, আর নিজের বিবেকের কাছে?
তাই আসুন না, একটু খুঁজে দেখি- কত টুসিরা আছে আমাদের অপেক্ষায় তাদের সাথে ইফতারের আনন্দ ভাগ করে নিতে ক্ষতি কি? কত জিনিষই তো অপচয় হয়…
পবিত্র মাসে আমার আপনার অন্তর এভাবেই হয়ে উঠুক আরো কিছুটা পবিত্র!

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

অন্যান্য লেখা

Leave A Reply