বারুইপুর হাসনাবাদ রেলভ্রমন

0
লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন
  • 50
    Shares

অনেকদিন ধরেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, আমি যে দীর্ঘ রাস্তা বারুইপুর থেকে হাসনাবাদ, প্রত্যেকদিন যাতায়াত করি তা একটা ছোটখাটো ভ্রমনের সমান। যাতায়াতে সময় নেয় প্রায় ৮ঘণ্টা। এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করে খুব কম কর্মচারী অফিস ডিউটি পালন করে থাকেন। এই ৮ঘন্টায় আমি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সামিল হই। সেই অভিজ্ঞতা সবার সংগে শেয়ার করলাম।

দীর্ঘ পথ জার্নির কথা ভেবে আমাকে কাক ভোরেই উঠতে হয়,যদিও লেট আওয়ারে শুতে যাই। বলা যায়, একপ্রকার অনিশ্চিত ঘুম। চোখ কচলাতে কচলাতে রুটিন মাফিক অফিসের প্রস্তুতি নিই, তারপর ৬-২০ নাগাদ বাড়ি থেকে প্রায় ঢুলতে ঢুলতে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আমার প্রথম রেলওয়ে স্টেশন বারুইপুর জংশন। জমজমাট একটা স্টেশন, লক্ষ্মীকান্তপুর,ডায়মন্ডহারবার লাইন দুটি এখান থেকে দুভাগে ভাগ হয়েছে।

শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার ট্রেনে বারুইপুর ছাড়া অন্য কোনো গাড়িতে চড়তে গেলে রীতিমত দৈহিক কসরত করতে হয়। ভোর থেকেই প্রতিটি গাড়িতে বাদুড় ঝোলা অবস্থা, মাছি গলার অবস্থায় থাকে না। সেখানে আমার মতো দুর্বল মহিলা বারুইপুর লোকাল ছাড়া আর কোন গাড়ির কথা ভাবতেই পারে না। সহযাত্রীদের সৌজন্যে ৬-৫৮র বারুইপুর লোকালের একটা কোনে গুটিসুটি মেরে বসার একটা সিট পাই। তারপর কোলাহল, চিৎকার, চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলি, কনুইয়ের গুঁতো…. সবই উপেক্ষা করে কখন এক সময় গভীর ঘুমে ঢুলে পড়ি। রাতের বাকি ঘুমটা এখানেই হয়ে যায়। এরই মধ্যে প্রতিটি স্টেশন থেকে হাজার হাজার প্যাসেনজার প্রায় গিলতে গিলতে শেষে শিয়ালদহ স্টেশনে এসে একেবারে উগরে দেয়। শিয়ালদহে নেমেই পিল পিল করে জনতা এদিক ওদিক যে যার দরকারী দিকে ছুটতে থাকে। মনে হয় এই বুঝি একে অন্যের সংগে ধাক্কাধাক্কি লেগে গেল, কিন্তু না, সবাই শৃঙ্খলা মেনে পাশ কাটিয়ে যে যার গন্তব্যে যাবার ট্রেন ধরে ফেলে।

আমার ট্রেন ৮-২০,সময় তখন ও থাকে, তাই ধীরে ধীরে রীতিমত চেকারের পাশ দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে শিয়ালদহ মেইন লাইনে চলে আসি। ইলেকট্রনিক্স সময় সূচির দিকে লক্ষ্য থাকে। এক সময় ঘোষনা হতে থাকে, হাসনাবাদ লোকাল অমুক প্লাটফর্ম থেকে ছাড়বে। সামনের লেডিস কম্পার্টমেন্টে ধীরে সুস্থ, সবচেয়ে ভালো জানলার ধারের সিটটি খুঁজে বসে পড়ি। সর্বসাকুল্যে ৫-৬ জন যাত্রী শিয়ালদহ থেকে এই ট্রেনে চড়ে বসে। একেবারে ফাঁকা ,পা তুলে আরাম করে, ফেস বুক ঘেঁটে, week end tour এর লেখা পড়ে, ভালো ভালো কমেন্ট দেওয়ার একটা যুতসই পরিবেশ খুঁজে পাই।

দক্ষিণ শাখার মতো এত বেশী ভীড় হয় না। বেশীর ভাগ স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষিকা আর আমাদের মতো কিছু সরকারী কর্মচারী এই লোকালে প্রতিদিন যাতায়াত করে, ভিড় গায়ে লাগার মতো নয়, প্রায় প্রতিটি প্যাসেনজার বসার সিট পায়। বারাসাত পর্যন্ত ধীর গতিতে স্টেশান থেকে অল্প সল্প প্যাসেনজার তুলতে তুলতে এগিয়ে যায়। শহুরে ব্যস্ততা, কোলাহল, ধূলো, ধোঁয়া এড়িয়ে বারাসাত ক্রস করার পর প্রকৃতির দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে থাকে আর তার সাথে ট্রেনের গতিবেগ তীব্রতর হতে থাকে।

কাজীপাড়া স্টেশনের পর থেকে মনে হবে কোন এক পক্ষীরাজের পিঠে চড়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলেছি কোন এক অজানা দেশে। শতাব্দী, রাজধানীর গতিবেগ এই ট্রেনের কাছে হার মেনে যায় যেন। স্টেশনগুলির মধ্যে বেশ দূরত্ব থাকায়, স্টেশনে ঘন ঘন ট্রেন থামে না। ফলে ট্রেনের গতি শরীরে দুলুনি এনে দেবে। তাই বলে, ঘুমিয়ে পড়বেন না যেন? ঘুমিয়ে পড়লেই মিস করবেন অনেক কিছুই! কেউ যদি সত্যজিত রায়ের “পথের পাঁচালী” দেখে থাকেন কিংবা বিভূতি ভূষণের “আরণ্যক “পড়ে থাকেন, তাহলে তার কিছুটা স্বাদ এই যাত্রাপথ থেকে পেতে পারেন।

বিস্তৃত মাঠ, মাঝখান দিয়ে সজোরে ছুটে চলেছে ট্রেন…. মাঠের জমিন খুবই অপরূপা, ঊর্বশী, উর্বরা,সব সময় প্রসব করে চলেছে হরেক রকম ফসল,,,,,,ঐযে যেথায় নীল আকাশটা মিসেছে মাটির সনে ,সেথায় সবুজ বন তটে আছে ছোট ছোট গ্রাম। গ্রামের কিষান, কিষানি রোজ আসে মাঠে চাষের কাজে। কিষান হালের মুঠি ধরে লাঙ্গল চষে মাঠে ,কিষানি গামছায় পোঁটলা করে নিয়ে এসেছে পান্তাভাত তার তরে। কেউ কেউ গাছের ছায়ায় বসে হাল্কা বিশ্রাম নিতে ব্যস্ত…..মাঠে বাঁধা গোরু ছাগলগুলো নধর ঘাস খেয়ে চলেছে একমনে, তাকাবার সময় যে ওদের নাই, বেলা যে পড়ে এলো…..বকের দল ইতি উতি খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের খাবার, চষা নাঠে ভিড় করেছে বিস্তর। বাড়ির সবাই ব্যস্ত সমস্ত ফসল তোলার কাজে, ঠায় রোদ্দুরে বিরাম নেই যেন তাদের। সবজি যে ষাবে শহরে কলকাতার বাবুদের লগে।

ট্রেন ছুটে চলেছে বিরামহীন, আমবন, বাঁশবন, শীতল ছায়ায় ঢাকা মাটির কুটিরের পাশ ঘেঁষে, চোখে পড়বে তাদের ব্যস্তময় জীবনে।হয়ত দাবায় বসে পুরুষটি পাট কাটতে ব্যস্ত, দুধের শিশুটি বড়ই করে জ্বালাতন, মা তারে বেঁধে রেখেছে দড়ি দিয়ে খুঁটির সনে, সেও বড় ব্যস্ত রান্নার কাজে। ল্যাংটা খোকাটা পথের ধারে হাঁ করে আছে ছুটন্ত ট্রেনের পানে চেয়ে। ফসলের বোঝাগুলো বড্ড বেশী ভারি, মাথায় চাপিয়ে মেঠো পথ ধরে চলেছে দলে দলে।

ধানের শীষে হলুদ হলুদ রঙ ধরেছে, হাওয়ায় ঢেউ খেলে যায় তাতে। মাঝে মাঝে লাল হলুদ গাঁদার ক্ষেত ভালই লাগে বেশ। আমবাগানের ছায়ায় ভিড় জমিয়েছে কোন ভিন দেশী বেদের দল। রোজ দেখি ধোঁয়া তুলে রান্না করতে। রাতে থাকে তারা তাঁবু খাঁটিয়ে।
বোশেখ জৈষ্ঠ মাসে মাঠ ভরে যায় পাটের ফসলে, চডাই, ভারা ভিড় জমায় পাটের ক্ষেতে। ফুড়ুত ফুড়ুত করে পাটের বনে কি যে খায়, মন ছুটে যায় সেদিক পানে।

এদিকের স্টেশন গুলোর নাম ভীষণ বিদঘুটে, উচ্চারণ করতে লাগে ভালই খটকা। কি জানি কোথা থেকে এলো এমন নাম। জানলাম, রেললাইনের দুধারের গাঁয়ের নাম অনুসারে হয়েছে …. কাঁকড়া মির্জানগর, ঘোড়ারাস ঘোনা আরও আছে… ভাসিলা, ভ্যাবলা, মার্টিনিয়া অনন্তপুর।

আগে নাকি এই লাইন দিয়ে চলত কয়লার ইঞ্জিন টানা রেলগাড়ি। সারাদিনে দুটি, একটি যাওয়ার,আর একটি ফেরত আসার। সময় নিত সে অনেক বেশী।কালো ধোঁয়া উড়িয়ে কু ঝিক ঝিক করতে করতে সে শূন্য মাঠে ছুটে যেত…..

শুনেছি, পুরোনো দিনে ফিল্ম ডিরেক্টরদের বড়ই পছন্দের জায়গা ছিল এই হাসনাবাদ রেললাইন। তাই, ফিল্মে কয়লার ইঞ্জিন টানা রেলগাড়ির সিন থাকলে, অবাক হওয়ার জায়গা থাকে না।

আচ্ছা, এমন কোন মন্দির আছে কি, যেথায় পূজা অর্চনা হয় না!…. আছে এই লাইনেই. .. বহিরা কালিবাড়ি স্টেশনের পাশেই। গাছগাছালির শীতল ছায়ায় মন্দিরটি দাড়িয়ে আছে। কি নির্জনতা! কি শান্তি! মনে হয় নেমে পড়ি এই স্টেশনেই।
বন্য প্রকৃতি ঘেরা একক প্লাটফর্মের দেখা পাবে এই লাইনেই।

বসিরহাট, টাকী বড় বিখ্যাত নাম, ইতিহাস ছুঁয়ে আছে এই প্রাচীন ছোট্ট শহর ঘিরেই।
আজ থাক, পরে না হয় বলব টাকীর কথা। আজ যাব হাসনাবাদ।

বিকালে ফেরার ট্রেনে,
রোজ দেখা পাই একজনের সনে।
পরনে পরিপাটি শাড়ি, বব ছাঁট চুল, চোখে সান গ্লাস, ঠোঁটে লিপস্টিক, হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ।
বসে জানলার ধারে এক কোনে,
সহযাত্রীরা আমাকে রসিকতা করে বলে ……দেখেছ, তোমার প্রেয়সীকে?
বসেছে সে ঐ ধারের সীটে।
সে বিড় বিড় করে কথা বলে তার প্রেমিকের সনে,
লজ্বায় মুখ রাঙা হয়ে ওঠে,
মুখ ঢেকে দেয় দু হাত দিয়ে …..
ওর ঠিকানা কেউ জানে না, সবাই বলে ও নাকি পাগল।
বোধ হয়, হারিয়েছে এই লাইনেই ওর প্রিয়তমকে,
তাই সে রোজ খোঁজে তাকে।

সূর্য দেথ! কেমন দিগন্ত রাঙিয়ে দিয়েছে, লাল গোলায় এখুনি ডুবে যাবে পশ্চিম দিগন্তে। তারপর তেপান্তরের মাঠে অন্ধকার নেমে আসবে।
দূরে দূরে গাঁয়ে চিমটি করে জ্বলে উঠবে আলো। ঠিক তখনি কানের কাছে ভেসে আসবে…… চায়ে চায়ে…. ছোলা ভাজা খাবে নাকি?

বাবুদার চপ মুড়ি পাঁচ টাকা দাম, সংগে ফ্রি থাকে একটা কাঁচা লঙ্কার চপ।
মধুদার মো মো, স্যান্ডুইজ,পিতজা মুখে লেগে থাকার মতো।
কম যায় না কাজু বাদামের টেস্ট।
সহযাত্রীদের সংগে খুনসুটি আড্ডা,
আর তার সাথে পেয়ারা মাখা।
দেখতে দেখতে কখন এসে যাবে শিয়ালদহ, টের পাই না।

শিয়ালদহে নেমেই দক্ষিণ শাখার ট্রেন ধরতে দৌড় লাগাতে হয়। যা পাই ডায়মন্ড কিংবা লক্ষীকান্তপুর তাতেই ঠাঁই নিই।

এখানেই এসেই মনে হবে রোমান্টিক জগত থেকে এক লহমায় রুক্ষ, শুষ্ক, কঠোর বাস্তব জগতের দোরগোড়ায় হাজির হয়েছি। একান্ত দরকার ছাড়া ধোপ দুরস্ত ভদ্রলোকেরা তেমন একটা পছন্দ করে না এই গাড়ি চড়তে।

এখানে রোকেয়া, রুবিনা, সুলতানারা ওঠে।এরা সবাই কলে কারখানায় কিংবা বাবুদের বাড়িতে কাজ করে। দেহের লাবণ্য অকালেই ঝরে গেছে। কথায় কথায় বাংলা খিস্তি, চু ইন গান কিংবা পান পরাগে মুখ রাখে ব্যস্ত। কানে কর্ড লাগিয়ে সস্তার হিন্দী গান শোনা কিংবা একসাথে বেদের মেয়ে জ্যোতস্নার গান গেয়ে ওঠা। রেলা মেরে শরীর বের করে গেটের রড ধরে ঝোলা।

বয়স্করা সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে গেটের কাছে পাদানিতে বসে গান ধরে…..
হরি দিন তো গেল পার করো আমারে…….
কামরার ছোট ছোট খোপ গুলো থাকে দজ্জাল মক্ষীরানীর অধীন। সে যেখানেই থাকুক তার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে খোপের নির্দিষ্ট সিট। তাকে না জ্বালানই ভাল, তা না হলে কামরা গরম করে দেবে কাঁচা খিস্তিতে। মাঝে মাঝে নতুন অতিথির সংগে মারামারি, চুলোচুলি পর্যন্ত গড়াতে দেখা যায়। এরা সবাই বাস্তবের সংগে সারা জীবন লড়াই চালায়, তাই না, এরা এত রুক্ষ, শুষ্ক। কঠোর বাস্তবকে স্বচক্ষে দেখতে দেখতে ধূলো ধোঁয়া বিষ বায়ু মেখে ঘরে ফেরা। পরের দিনের প্রস্তুতি নিয়ে শেষ রাতে শুতে যাওয়া।

বারুইপুর হাসনাবাদ রেলভ্রমন

Flickr Album Gallery Powered By: Weblizar

লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন
  • 50
    Shares

★আপনার মূল্যবান মন্তব্য দিয়ে আমাদের পথ চলা ধারাকে অব্যাহত রাখুন★

★ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে কমেন্ট করুন★

Leave A Reply