গরুর রচনা

1
Image : Anandabazar

Image : Anandabazar

‘গরু একটি গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণী।’ – একদা লেনিন সরণীতে ঝালমুড়ি খাইতে খাইতে এই লেখ্যটি আমি আবিষ্কার করি। এক হতভাগ্য ছাত্রের পরীক্ষার উত্তরপত্রের অংশবিশেষে তাহার ভবিষ্যতের নিদর্শনস্বরূপ ঝালমুড়ি পরিবেশিত হইতেছিল এবং কোন স্বজন ব্যক্তি উহা সম্পূর্ণরূপে উদরসাৎ করিতে অক্ষম হওয়ায় উচ্ছিষ্টাংশ সরণীর পার্স্বে ফেলিয়া গিয়াছিলেন। সেই অবশিষ্টাংশ লেহন করিতে করিতে আমি আমার বিষয়ে এই লেখ্যটি দেখিতে পাই।

আশ্চর্য হইয়াছিলাম! কোন বালক আমার কথা ভাবিয়াছে এবং আমার উদ্দেশে দুই-চারি বাক্য লিখিয়াও ফেলিয়াছে, ইহা জানিতে পারিয়া আমি যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইয়াছিলাম। তাহার লিখিত বর্ণনা আমার দৈহিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্টের সহিত মিলিয়া যাইতেছিল। ইহার অর্থ, সেই বালক আমার বিষয়ে কৌতুহল পোষণ করে এবং কোন মুহূর্তে আমার অজ্ঞাতে দূর হইতে আমাকে পর্যবেক্ষণ করিয়া তথ্য সংগ্রহ করিয়াছে। কিন্তু কে এই বালক? তাহাকে কি আমি কোনদিনও দেখিয়াছি? স্মরণ করিতে পারিলাম না!

তবে আমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত এই বালক আর যেই হউক, আমার পূর্বতন প্রভুর বংশদ্ভুত নহে। সাত বৎসর আমি তাহার গৃহে বসবাস করিলাম, তিনি একটি ক্ষণেও আমার কথা ভাবিলেন না, উপরন্তু আমাকে চিরকাল কষ্টই দিয়া গেলেন! আমি থাকিতাম বেলাঘাটা খাল পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের একটি গোশালায়। আমার অনুরূপ অনেক গাভীর গৃহ ছিল সেটি। জন্ম কোথায় তাহা স্মরণে নাই। প্রথম স্মৃতি উদয় হয় এক বর্ষণমুখর রাত্রে – যেদিন শিশু আমাকে আমার গৃহে আনা হয়। যানবাহনটি হইতে উত্তরণের মুহূর্তে কর্দমাক্ত ভুমিতে আমার পদস্খলন ঘটে। তাহার পর হইতে আমি সম্মুখের একটি পদে বল পাই না, যৎসামান্য বেসামাল হইয়া চলি। তবে বেদনাতুর হইয়াও আমি ক্রন্দন করি নাই, পাছে আমার প্রভু বিচলিত হইয়া পরেন!

সেইক্ষণে বুঝি নাই যে আমার শত বেদনা সত্ত্বেও তিনি কোনদিনও বিচলিত হইবেন না এবং আমাকে বাকি ছাব্বিশটি গাভীর সহিত ক্ষুদ্র পরিসরে আবদ্ধ রাখিয়া তিনি পার্শ্ববর্তী প্রকোষ্ঠে নাসিকাধ্বনী সহ সুখনিদ্রায় যাইলেও আমি স্থান সঙ্কুলান হওয়ায় বাকি গাভীদিগকে ‘হাম্বা’ বলিয়া সরিয়া যাইতে বলিতে পারিব না – পাছে আমার ডাকে প্রভুর নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে! বর্ষা এবং শীতঋতুতে আমরা যৎপরোনাস্তি অসুবিধার সম্মুখীন হইতাম। শীতে হিমেল বাতাস উন্মুক্ত গৃহে প্রবেশ করিয়া আমার পঞ্জরাস্থি অবধি নাড়াইয়া যাইত। আর বর্ষায় ছিল মশকের উপদ্রব – সারারাত্রি পুচ্ছের দ্বারা বাতাস করিয়াও নিস্তার পাইতাম না। মশক তাড়াইবার প্রয়াসে অত্যাধিক শব্দ করিলে ভাগ্যে জুটিত বেত্রাঘাত – মশক ইহা হইতে অধিকতর শ্রেয়।

অকালেই আমার শরীরে যৌবন আসিয়াছিল। আমার প্রভু সূচ দ্বারা আমার দেহে যেসকল ঔসধ প্রয়োগ করিতেন, তাহার ফলস্বরূপই যে আমি বয়সের পূর্বে ঋতুমতী হইয়াছিলাম – এ ব্যপারে আমি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত। আর যৌবন আগমনের সাথেই আমার লাঞ্ছনা শতগুনে বর্ধিত হইল। মাত্র ৮ মাস বয়সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে এক অপরিচিত পুরুষের সহিত সহবাস করিতে বাধ্য করা হয়। আমি ধর্ষিতা হই, গর্ভবতী হই।

প্রথম সন্তান প্রসবের মুহূর্ত আমার জীবনের অন্যতম সুখের মুহূর্ত ছিল। কিন্তু সেই সুখও ছিল ক্ষণস্থায়ী। সে সন্তান – আমার প্রথম পুত্রের ভাগ্যে আমার দুগ্ধের কণামাত্রও জুটিত না। সে দূর হইতে দেখিত যে তাহার ভাগের খাদ্য দোহন করিয়া তাহাকে অভুক্ত রাখা হইতেছে। সে কাঁদিত না, কাঁদিতে সে শেখে নাই তখনও।

একদিন সেই সন্তানকে হারাইলাম। অন্য গাভীদের নিকট হইতে শুনিয়াছিলাম আমার প্রভুর অভিসন্ধিতে তাহাকে কোন এক কসাইখানায় স্থানান্তরিত করা হইয়াছে। তাহার নিয়তির কথা ভাবিলে আজও শিহরণ জাগে। সেদিন আমি কাদিয়াছিলাম। কিন্তু আমার ক্রন্দন শুনিবার মতো কেহ ছিল না।

আমাকে গর্ভবতী করিবার প্রয়াস চলিতে থাকিল। আরও অনেক সন্তানের জন্ম দিলাম এবং তাহাদের হারাইলাম। একবার জন্মের পরমুহূর্তে পরিচর্যার অভাবে এক সন্তান আমার চক্ষের সম্মুখেই প্রাণ ত্যাগ করিল। কিন্তু আমাকে দোহনের কার্য্য তখনও থামিল না। সাথে ঔষধ প্রয়োগও চলিত। আমার উদরে প্রচণ্ড বেদনা হইত, খাদ্যে অরুচি বোধ জন্মাইত, ক্রমাগত বিষ্ঠা ত্যাগ করিতাম। কিন্তু দোহন কার্য্য কখনই থামিত না। এমনও ঘটিয়াছে যখন আমি পূর্বের সন্তানের নিমিত্তে দুগ্ধ প্রদান করিতেছি এবং আমার গর্ভে বৃদ্ধি পাইতেছে আমার নতুন সন্তান। এইভাবে সাত সন্তানের জন্ম দিয়াছিলাম, কিন্তু আমার ভাগ্যে মাতৃসুখ জোটে নাই কোনদিনও। প্রতিবার এই কারাগারে আমার প্রভু কংসের ন্যায়ে আসিয়া আমার সন্তানদিগকে হরণ করিতেন। বন্ধন না থাকিলে বোধকরি তাহাদের রক্ষা করিতে সমর্থ হইতাম।

তাহাদের অধিকারের এতো পরিমাণ দুগ্ধ কোথায় যাইত তাহাও জানিতে পারি নাই কোনদিনও। হয়তো তাহা কোন অষ্টম সন্তানের প্রয়োজনে আসিয়াছিল, যাহার অস্তিত্ব আমার অবগত নহে! আচ্ছা এই বালক, যে আমার সম্পর্কে এতকিছু লিখিয়াছে, এই দুগ্ধ কি তাহার নিমিত্তে ছিল? যদি ইহাই সত্য হয় তবে আমার অন্তরাত্মা যৎসামান্য শান্তি পাইবে। আমি পূর্বে তাহার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যেসকল কটু মন্তব্য করিয়াছি তাহা এক্ষনে ফিরাইয়া লইলাম।

আমার সন্তানধারণের ক্ষমতা নিঃশেষিত হইলে এক প্রাতে আমার প্রভু আমাকে বেত্রাঘাত করিয়া গৃহ হইতে বাহির করিয়া দেন। রাগে অপমানে আমি গৃহাভিমুখে আর কোনদিনও ফিরি নাই। এখন কলিকাতা নগরীর জনবহুল অঞ্চলগুলি আমার বাসস্থান। খাদ্যাভাব হয়না, কারণ এই শহরের অধিবাসীসকল যে পরিমাণ খাদ্যবস্তু অপচয় করিয়া থাকেন তাহাতে আমার মতো সহস্র গাভীর উদরও শান্ত হইবে। প্রভুর নাগপাশ হইতে মুক্ত হইয়া, স্বাধীন হইয়া আমি সুখেই ছিলাম। সাত বৎসরকাল নরকভোগের পর আমার পুনর্জন্ম ঘটিয়াছে – এইরূপ বোধ হইতেছিল। কিন্তু গতকালের অদ্ভুত অভিজ্ঞতার পর আমি কিয়দাংশে ভারসাম্য হারাইয়াছি।

গতকাল মেছুয়া অঞ্চলের নিকটবর্তী উচ্ছিষ্টদানীতে মুখ ঢুকাইয়া খাদ্যের অনুসন্ধান করিতেছিলাম, হঠাৎ কলরব শুনিয়া মুখ বাহির করিয়া দেখি কিছু অদ্ভুতদর্শন ব্যক্তি সঙ্গীত পরিবেশন করিতে করিতে আমার অভিমুখে আসিতেছেন। তাহাদের পরনে ছিল গৈরিক বস্ত্র, মস্তকে রক্তবর্ণের টিকা – আমার সম্মুখে আসিয়া তাহারা দাঁড়াইল। আমার কিংকর্তব্য অবস্থার সুযোগে তাহাদের মধ্যে এক ব্যক্তি আমার গলদেশে মাল্যদান করিয়া আমার মস্তকে তাহাদের মস্তকের অনুরূপ একটি টিকা অঙ্কন করিলেন আর আমাকে বারংবার প্রণাম করিতে থাকিলেন। স্তম্ভিত হইলাম! কি ঘটিতেছে তাহা বুঝিতে না পারিয়া আমি এদিকে ওদিকে দেখিতে থাকিলাম। আর সেই মুহূর্তে যাহা অবলোকন করিলাম তাহাতে আমার শ্বাস রুদ্ধ হইয়া আসিল। আমার পূর্বতন প্রভু সেই গৈরিক-বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত! তিনি এবং তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা দলভুক্ত হইয়া মনের আনন্দে সঙ্গীত পরিবেশন করিতেছেন এবং খঞ্জনী বাজাইতেছেন। সঙ্গীতের কথা বুঝিতে পারিতেছিলাম না, খঞ্জনীর শব্দই অধিক কর্ণে আসিতেছিল। কিন্তু সকলে যখন একযোগে হর্ষধ্বনী করিলেন এবং প্রভুদিগের সহিত কণ্ঠ মিলাইলেন, বেশ বুঝিতে পারিলাম সেই সঙ্গীত আমাকে লইয়াই। তাহারা সকলে আমাকে ‘মাতা’ বলিয়া সম্বোধন করিতেছেন!

হর্ষোল্লাশ শেষে আমার সম্মুখে একটি কদলিপত্রিকাতে কিছু খাদ্যবস্তু রাখিয়া, ভক্তিভরে প্রনাম করিয়া তাহারা চলিয়া গেলেন। সেই খাদ্য আমি স্পর্শ করি নাই। একদল সারমেয় তাহা উদরসাৎ করিল। তখনও আমার কর্ণে বাস্তবের তুলনায় উচ্চগ্রামে পূর্বের সঙ্গীত এবং খঞ্জনীর শব্দ বাজিতেছিল – সাথে ক্ষীণ ‘মা’ ‘মা’ রব, যাহা বোধকরি আমার মৃত সন্তানদিগের কণ্ঠস্বর! বহুক্ষণ সেই স্থলে দাঁড়াইয়া রহিলাম। সম্বিৎ ফিরিবার পর হইতে আমি নগরীর বিভিন্ন স্থানে উন্মত্তের ন্যায়ে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। স্মৃতিতে মৃত সন্তানদিগের মুখ বারংবার ফিরিয়া আসিতেছে। তাহাদের ক্রন্দন আমি স্পষ্ট শুনিতে পাইতেছি। নগরীর একপ্রান্ত হইতে অপরপ্রান্তে পৌছিয়া গিয়াছি কিন্তু থামিতে মন চাহিতেছে না। মাতৃস্থানীয়া যাহাদেরই দেখিতেছি, ‘হাম্বা’ রব করিয়া তাঁহাদিগকে সাবধান করিতেছি। বলিতেছি – “তোমরা সন্তানের জন্ম দিওনা! উহারা যাহাকে জননী বলিয়া সম্বোধন করে, তাহারই ধর্ষণের আয়োজন করে। অর্থের প্রয়োজনে নিজের ভ্রাতা-ভগিনীকে বিক্রয় করে – হত্যা করে। মাতাকে সর্বস্বান্ত করে। এমন সন্তানের জন্ম দিও না তোমরা!”

কিন্তু আমার ‘হাম্বা’ রব মনুষ্যসকলের বোধগম্য নহে!

লেখক : সুব্রত

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেন

About Author

আমার নিঃশব্দ কল্পনায় দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি, আমার জীবনের ঘটনা, আমার চারপাশের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে লেখার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষেরই ঘন কালো মেঘে ডাকা কিছু মুহূর্ত থাকে, থাকে অনেক প্রিয় মুহূর্ত এবং একান্তই নিজস্ব কিছু ভাবনা, স্বপ্ন। প্রিয় মুহূর্ত গুলো ফিরে ফিরে আসুক, মেঘে ডাকা মুহূর্ত গুলো বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ুক। একান্ত নিজস্ব ভাবনা গুলো একদিন জীবন্ত হয়ে উঠবে সেই প্রতীক্ষাই থাকি।

1 Comment

Leave A Reply