“সত্য বড়ই কঠিন …. কঠিনেরে ভালোবাসিলাম….”

0
লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন

রূপকার – শিলাদিত্য গুহ রায়

স্বর্গ রাজ্যের সরোবরের পারে বসে আছেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু … আনমনে কি যেন ভাবছেন। পেছন থেকে এসে মাস্টারদা সূর্যসেন কাঁধে হাত দিয়ে বললেন – কি ভাবছ বন্ধু? এত আনমনা হয়ে ….দেশের কথা মনে পড়ছে? ক্ষুদিরাম বসু হেসে বললেন – না ভাই! দেশের কথা মনে পড়ে না এখন আর…! দেশের অবস্থা দেখে শুধু সেই সময়ের কথা মনে পড়ে… যে সময় আমারা জীবিত অবস্থায় দেশে ছিলাম। তখন ইংরেজদের রাজত্বেও মনে হয় এমন অবস্থা দেশের হয়নি, যা আজ হয়েছে। ঠিক এই সময় ই বিনয়, বাদল আর দীনেশ এসে বসলেন ক্ষুদিরাম বসুর পাশে। মাস্টার দা বললেন, কি হে তোমাদের কি মত? দেশের অবস্থা এখন কেমন দেখছো? বিনয় বললেন , মাস্টার দা তোমার কি মনে হয় না… আমরা আমাদের জীবনের সোনালি সময়টুকু মিছেই নষ্ট করেছিলাম? বাদল বললেন, মাস্টার দা কি ভাবেন জানিনা.. তবে আমার আর দীনেশ এর কিন্তু এখন এটাই মনে হয় …যে…. তখন সত্যিই আমরা বোকা ছিলাম।

মাস্টার দা এতক্ষণ চুপ ছিলেন….। মাস্টার দা বললেন, জানো যেদিন আমার ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল … তার আগের দিন রাত দশটা নাগাদ আমি জেলের মধ্যেই বসে আমার সংগ্রামী জীবনের কাহিনী গুলি লিখছিলাম। এমন সময় এক ইংরেজ জেলার ও দুই জন দেশী অফিসার আমার সেলে ঢুকলেন। দেশীয় অফিসার দের একজনের হাতে একটা মোটা ভারী হাতুড়ি, আরেক জনের হাতে একটি সাড়াশি। এরপর আরও তিন জন হাবিলদার এলো। চারজন মিলে আমার দুটো হাত আর পা দুটো শক্ত করে চেপে ধরলো। একজন দেশী অফিসার সারাশি দিয়ে আমার হাতের নখগুলো একের পর এক উপড়ে দিতে লাগলেন। অসহ্য যন্ত্রণাতে আমি চিৎকার করতে লাগি। ইংরেজ জেলার বললেন BEAT THE SCOUNDREL HARD…AND HARD…EVERY REVOLUTIONARIES SHOULD KNOW THE RESULT…!! এই সময় হঠাৎ একজন দেশী অফিসার তার হাতের হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আমার দুটো হাঁটু ভেঙে দিলেন… আমি প্রায় সংজ্ঞাহীন…শেষ হলোনা…এরপর আমার দুটো হাতের কনুই ও ভেঙে দিলো…!! বিপ্লবীর মুখ বন্ধ করার জন্য শেষে হাতুড়ি মেরে আমার মুখ দাঁত সব ভেঙে দিলো। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আমার মুখ থেকে শুধু গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই আসছিলো না। সারা শরীর রক্তে রক্তাক্ত। হাঁটার ক্ষমতা শূন্য, প্রান শরীর ছেড়ে যন্ত্রণা মুক্তির জন্য করুন মিনতি করছে…. কোন মতে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় আমায় ঐ রাতেই ফাঁসি তে ঝুলিয়ে দিলো। আমার শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি হলো। মৃত্যুর সময় বন্দেমাতরম শব্দটাও উচ্চারণ করতে পারিনি, কেটে যাওয়া জিভ আর ভেঙে যাওয়া দাঁত গুলি মুখের মধ্যে দলা পাকিয়ে গেছিলো। তারপর আমার দেহ টা ওরা নিয়ে গিয়ে রাতের অন্ধকারে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলে ফেলে দিলো। অনেক যন্ত্রণা পেয়েছিলাম… কিন্তু শেষ টায় ভেবেছিলাম এক সুন্দর ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছি, নিশ্চয়ই স্বপ্ন সত্যি হবে। কিন্তু আজ ভাবলে সেদিনের থেকেও অনেক অনেক বেশী যন্ত্রণা হয় …বন্ধু ।

সবাই একমনে বসে বসে মাস্টারদার কথা শুনছিলো। ক্ষুদিরাম বসু হেসে বললেন, আসলে আমরা কেউই বুঝিনি যে স্বাধীনতার পর দেশের এমন অবস্থা হবে। ফাঁসির আগে যখন ঐ কটা দিন জেলে ছিলাম তখন একদিন এক ইংরেজ অফিসার এসে প্রফুল্লদার রক্ত মাখা জামা কাপড় গুলি দেখিয়ে আমায় আধা আধা বাংলা তে বললেন, FREEDOM লইয়া টোমরা কি করিবে… খোকা? তারপর তো ক্ষমতার জন্য নিজেরাই নিজেদের মারিবে আর মরিবে..! কেন এমন করিয়া নিজেরাই নিজেদের মারিতেছো..! তার চেয়ে আমাদের শোষণ করিতে দাও আর নিজেরাও শান্তিতে থাকো। সেদিন বুঝিনি কথাটা যে এতোটাই সত্য ছিল।

নিস্তব্ধ পরিবেশ, বাদল বলে উঠলেন, আমরাও তিন জন যখন রাইটার্স বিল্ডিং এ ঢুকেছিলাম, দেশমাতৃকার চরনে প্রান দেব জেনেই প্রবেশ করেছিলাম। অত্যাচারীদের শেষ করে সুন্দর অনাচার মুক্ত দেশ গড়তেই আমারা এই সংকল্প নিয়ে ছিলাম। কিন্তু আজ যখন দেখি আমাদের সেই বলিদান শুধু বইয়ের পাতায় রয়ে গেছে ভীষণ কষ্ট হয়। ভেবেছিলাম আগামী প্রজন্মকে সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দিয়ে গেলাম। ভুল ভেবে ছিলাম সেদিন।

ইতিমধ্যে সুভাষচন্দ্র বসু আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিঃশব্দে পিছনে দাড়িয়ে সব শুনছিলেন। সুভাষ বাবু নীরবতা ভেঙে বললেন,…তোমাদের একটা কথা বলি ভাইরা..আসলে ক্ষমতার লড়াই আর ক্ষমতার লোভ সেই সময়েতেও ছিল। আমাদের সেই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের সময় যারা অহিংসার কথা বলতেন…তাদের মধ্যেও ছিল সর্বোচ্চ ক্ষমতার লোভ। অনেকদিন যখন এলগিন রোডের বাড়িতে গৃহবন্দি ছিলাম, হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। বিশ্বাসযোগ্য নিকটতম বন্ধুদের সঙ্গে নানান আলোচনাতে দিন ঠিক করলাম।শিশির কে বললাম প্রস্তুত হতে। জানো, সেই রাতে যখন বাড়ি থেকে শেষ বারের জন্য বেরোচ্ছি, খুব ইচ্ছে হচ্ছিল মা কে ঘুম থেকে উঠিয়ে প্রনাম করে বলি ” মা আমি আসি…” , কিন্তু পারিনি। ঘুমন্ত মা কে প্রনাম করেই বেরিয়ে আসি। মনের জোরে চোখের জল আটকে রেখেছিলাম। শিশির বলল – রাঙাকাকা কিছু হয়েছে? আমি বললাম- কই… কিছু না তো। ছদ্মবেশী রাঙাকাকা গাড়িতে উঠে বসলাম সন্তর্পণে। শিশির গাড়িতে উঠে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলল। আমি মনে মনে বললাম – আমার মা আমার দেশ, ভালো থেকো, জানিনা ফিরবো কিনা… তবে এটুকু জানি তোমার শিকল ছিড়তে না পারি…শিকল ভাঙার আঘাত হানব নিশ্চিত। বহু পথ প্রতিকূলতার পর একদিন পেশোয়ারে আছি। স্থানীয় যুবক আসিফ খবর দিলো আজ রাতেই সীমানা পেরোতে হবে। সঙ্গে থাকবে সেই যুবক আর এক স্থানীয় যুবতী সামিমা। রাতের অন্ধকারে এগোতে গিয়ে দেখলাম সামনেই ছোট্ট একটা সেনা ছাউনি। সেটা পেরোতে পারলেই আমাদের গন্তব্য। সামিমা আমায় প্রনাম করে বলল – সুভাষ বাবু আপনি চিন্তা করবেন না। আসিফ আপনাকে ঠিক পার করে দেবে। আমি সেনা ছাউনি তে গিয়ে ওদের নজর সরিয়ে দিচ্ছি। আপনি সেই সময়ের সাবধানে পেরিয়ে যাবেন। আমি ভাবছিলাম এই সব মেয়েদের কথা… কোন দিনই ইতিহাস জানবে না যাদের, আমার মনে থেকে যাবে এরা। সামিমা চলে গেল। গোরা সৈন্যরা সামিমা কে পেয়ে নারকীয় লীলায় মত্ত হতেই আসিফ আমায় সীমানা পার করে দিলো। যারা এভাবেই একদিন দেশের জন্য নিজেদের সবটা দিয়ে দিয়েছিলো… আর তাদের মতো মেয়েরাই আজ দেশীয় অসুরদের হাতে প্রতিনিয়তই লজ্জা হারাচ্ছে … শেষ হয়ে যাচ্ছে রোজ রোজ.. !! কেউ নেই বাঁচানোর … দেশ লুণ্ঠিত হচ্ছে প্রতিদিন!!..তার পর আরও মজার কথা হলো…. নানান প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে যখন আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে দেশের পথে আসছি , ভেবেছিলাম নতুন ভোর আসতে চলেছে.. স্বাধীন অখণ্ড ভারতবর্ষ আর বেশী দূরে নেই। একদিন প্রাক্তন অহিংসাকামী সহকর্মীর রেডিও ভাষ্যে শুনলাম “I WILL BE THE FIRST MAN, WHO WILL DEFEND SUBHASH”… শুনে ভেবেছিলাম এদের জন্যই কি ঘর ছেড়েছিলাম…! কেউ জানলোই না , যে প্লেন দুর্ঘটনাতেও আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, বার বার চেয়েছিলাম ফিরে আসতে দেশের মাটিতে। তাসখন্ডে শাস্ত্রীজীকে তেমনি ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম। তার পর রাজত্ব লোভী ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রের শিকার হলাম। শাস্ত্রীজী তো জীবিতই রইলেন না। সত্যিই বড্ড বোকা ছিলাম বোধহয়। – এই কথা গুলি বলতে বলতে সুভাষ কেমন আনমনা হয়ে গেছেন …

এই সময়ই কবি গুরু বললেন, আমার লেখা “ঘরে – বাইরে” নিশ্চিত তোমরা পড়েছ। আসলে কি জান? গনতন্ত্র হলো রাজতন্ত্রের একপ্রকার মুখোশ। রাজতন্ত্রে রাজা কে দোষী বলে , রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা যায়। সংগ্রাম করে রক্ত ঝরিয়ে রাজা কে নামিয়ে আনা যায় …। কিন্তু গনতন্ত্রের ক্ষেত্রে তোমরা কাকে দোষী বলবে ভাই? সবাই তো সবাই কে আঙুল তাক করে দোষী সাব্যস্ত করবে। আর এই বৃহৎ খেলার আড়ালেই অত্যাচারী রাজা তার রাজত্ব কায়েম করে থেকে যায় । বিচার ব্যবস্থা হয়ে যায় ক্ষমতার হাতে পঙ্গু। এখন অবশ্য একদল নতুন প্রজাতির জন্ম হয়েছে, তাদের নাকি বুদ্ধিজীবি বলে। তারা নাকি আবার মোমবাতি মিছিল করে প্রতিবাদ জানায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজকাল আবার বিতর্ক সভাও হয় শুনলাম। চারিদিকে আজ শুধু অপসংস্কৃতির দৃষ্টান্ত। আধুনিক হওয়ার চাহিদা তে মানুষ নিজের সংস্কৃতিকে ফেলে চলে গেছে বহুদুর। তাও রক্ষে… কেউ কেউ আজও আমার গান গুলি গায় আর শোনে। আসলে জন্মদিনের দিন ছাড়া আমারা সকলেই ব্রাত্য…,বুঝলে সুভাষ? তোমারা কি বলো মাস্টার?

মাস্টার দা বললেন – সত্যিই তাই গুরুদেব। একদম মনের কথা বললেন। ক্ষুদিরাম বসু হেসে বললেন – আমাদের কি তাহলে কিছুই করার নেই গুরুদেব? সুভাষচন্দ্র বললেন – জানিনা কবে সেই দিন আসবে আবার। বিপ্লব ঘটবে সবার মনে। বিনয় বললেন – ভগবানই ভরসা। দীনেশ বললেন – চিন্তা করবেন না… নিশ্চিত ভাবে ভবিষ্যতে বিপ্লবের উত্থান হবে… আমাদের সকলের স্বপ্ন সত্যি হবে।

সুভাষ বললেন, আমি শুধু এটুকুই আশা করি আবারও দেশের বুকে একঝাঁক তাজা রক্তের জন্ম হবে, আবারও নতুন স্বাধীনতার লড়াই হবে যা বিদেশী নয় দেশী অত্যাচারী শাসক কে টেনে নামিয়ে নিয়ে আসবে… ! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বললেন আসলে সুভাষ, তোমাদের কষ্ট বুঝি কিন্তু এটাও সত্য যে ক্ষমতার লোভ কে যতদিন না দেশের লোক পরাস্ত করতে পারবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের কোন স্বপ্নই সত্যি হবে না। দেশের মঙ্গল সাধন একমাত্র তখনই সম্ভব যখন প্রতিটি মনেই সেই শুভ চেতনার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হবে। তাই এই কঠিন সত্য কে মেনে নিতেই হবে। তাই তো আমি একসময় লিখেছিলাম –

“সত্য বড়ই কঠিন ….
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম….”

Source : facebook.com

লিখে পাঠাতে চান নিজের অভিজ্ঞতা বা লেখা ? পাঠান এই ইমেল-ঠিকানায়: i@pagolerprolap.in অথবা নিচে কমেন্ট করুন !

আপনার মতামত

About Author

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে এই লেখাটি নেওয়া হয়েছে। এই প্রবন্ধ বা পোষ্ট লেখকের পরিচয় যতটুকু পেয়েছি, লেখার নীচে দেওয়া হয়েছে। যদি কেউ এই লেখাটির লেখকের সন্ধান বিস্তারিত জেনে থাকেন, দয়া করে অবশ্যই জানাবেন। আমাদের email করুন এই ঠিকানায়, i@pagolerprolap.in অথবা লেখার নীচে কমেন্টে করুন। -- সঞ্জয় হুমানিয়া

Leave A Reply