মৎস্য মেলা, কৃষ্ণপুর, আদিসপ্তগ্রাম, হুগলী

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

মৎস্য মেলা, কৃষ্ণপুর, আদিসপ্তগ্রাম, হুগলী

লেখা ও ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

কথায় বলে ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’, ভাত আর সাথে মাছের লোভনীয় নানা রকম পদ যেন সমার্থক হয়ে গেছে ‘বাঙ্গালী’ শব্দটার সঙ্গে। বাঙ্গালীদের মধ্যে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষেরা আবার এর কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম, তাঁরা মূলত নিরামিষাশী। এই দুই বৈপরীত্য প্রতি বছর ১লা মাঘ একদিনের জন্য একবিন্দুতে মিলিত হয় কেষ্টপুরের ওরফে কৃষ্ণপুরের মৎস্য মেলাতে।

বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের এক শ্রীপাটে, মন্দির সংলগ্ন মাঠে বসেন অন্তত শ দুয়েক মৎস্য বিক্রেতা, আর ক্রেতা কয়েক হাজার, এ দৃশ্য সত্যিই বিরল।

কৃষ্ণপুর গ্রামে পৌঁছাতে গেলে ব্যান্ডেল, আদিসপ্তগ্রাম বা মগরা যেকোন স্টেশনে নামলেই চলে, তবে আদিসপ্তগ্রাম স্টেশনে নামাই সব থেকে সুবিধাজনক। অন্যান্য দিনে সজলভ্য না হলেও মেলার দিন অফুরন্ত টোটো বা ভ্যান রিক্সা পাওয়া যায়, আর পায়ে যদি জোর থাকে তাহলে মাত্র আড়াই কিলোমিটার রাস্তা, মেলার যাত্রীদের সঙ্গে হেঁটে যাওয়ার অনুভূতি একটু অন্যরকম বৈকি।
[amazon_link asins=’B01MT0QKAG,B077PWJQ57,B075778DZ9,B0756Z53JN,B0745BNFYV,B0756ZFXVB,B0771NV1K6,B076ZPJH37′ template=’ProductCarousel’ store=’sanjayhuman0c-21′ marketplace=’IN’ link_id=’a52f9c42-faa8-11e7-87bd-577699d45526′] ‘বৈষ্ণব শ্রীপাটে মৎস্য মেলা’ এ বিষয়ে অনেক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে, অলৌকিক কাহিনী গুলো বাদ দিলে আমার কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে যেটা মনে হয়েছে, আদিসপ্তগ্রামের রাজবংশের সন্তান শ্রীশ্রীমদ রঘুনাথ দাস গোস্বামী ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন। খুব অল্প বয়সে শ্রী শ্রী চৈতন্যদেবের আহ্বানে তিনি সব কিছু ছেড়ে সন্যাস নেন ও তাঁর কাছ থেকেই দীক্ষা নেন। রঘুনাথদাস গোস্বামী ছিলেন চৈতন্যদেবের ছয় শিষ্যের অন্যতম। দীক্ষা শেষে চৈতন্যদেব তাঁর ছয় শিষ্যকে তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োজিত হওয়ার নির্দেশ দেন, সেই নির্দেশ মেনে নিয়ে রঘুনাথ দাস গোস্বামী আদিসপ্তগ্রামে ফিরে আসেন। একমাত্র সন্তান গ্রামে ফিরে আসার খুশিতে পিতা গ্রামের সব লোককে খাওয়ালেন মাছ আর ভাত। সেই থেকেই প্রতি বছর ১লা মাঘ শ্রীশ্রী রঘুনাথদাস গোস্বামীর গ্রামে ফিরে আসার দিনটিকে স্মরণ করে কৃষ্ণপুর সহ আশেপাশের গ্রাম এমনকি অন্য জেলা থেকেও মানুষ এসে জড়ো হয় এই মাছ ভাতের পিকনিকে। সেই হিসাবে মেলার বয়স অন্তত ৫৫০ বছর।

ইতিহাস ছেড়ে মেলার কথায় ফেরা যাক, ‘মাঘের শীতে বাঘে পালায়’, সেই শীতকে উপেক্ষা করে ভোরবেলা থেকেই দলে দলে মানুষ মেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন। সেই মিছিলে সামিল ছোট্ট শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ, সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন। কেউ চলেছেন ভ্যান রিকশায় গ্যাসের সিলিন্ডার আর রান্নার সরঞ্জাম চাপিয়ে আবার কেউ চলেছেন জ্বালানী কাঠের বোঝা হাতে বা সাইকেলে নিয়ে। এই মিছিলে সামিল ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও, সেই জন্যই বলে মেলার চরিত্র আলাদা আলাদা হলেও কোন ধর্ম হয়না, তাই তো মেলা আমার এত প্রিয়। যারা গাড়ী নিয়ে আসছেন তাদের অনেকটা দূরে গাড়ী রেখে আসতে হচ্ছে আর সাইকেল, মোটর সাইকেলের স্থান মেলার কাছে স্কুলের মাঠে। সেখান থেকেই মাইকের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে আর মেলা মেলা অনুভূতিটাও। আরো বেশ খানিকটা হেঁটে শ্রীপাটের পাশের মাঠে তখন হৈহৈ রৈরৈ অবস্থা, বিক্রেতাদের হাঁকাহাঁকি ক্রেতাদের দরদামে কানপাতা দায়। কি নেই মাছের তালিকায় চেনা রুই, কাতলা, ভেটকি, মৃগেল, শোল, মাগুর, পুঁটি, পাবদা, চিংড়ি, ইলিশ, মৌরলা, সরপুঁটি, বড় বড় কাঁকড়াও হাজির, এমনকি ব্যারাকুডাও এছাড়াও অচেনা সামুদ্রিক মাছের তো ছড়াছড়ি। ক্রেতারা তাঁদের রুচি আর সামর্থ অনুযায়ী মাছ কিনছেন আর পাশের আমবাগান বা কলাবাগানে শতরঞ্চি পেতে বসে পড়ছেন। ঐদিন গ্রামের মানুষ যেন তাঁদের সব দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন পিকনিক করতে আসা মানুষদের জন্য। পাশের মাঠে আর বাগানে যখন এই রকম জমজমাট পরিবেশ তখন পাঁচিল ঘেরা শ্রীশ্রীমদ রঘুনাথদাস গোস্বামীর শ্রীপাটের ভিতরে তখন শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ, মানুষ ভক্তি ভরে পুজো দিচ্ছেন, প্রাসাদ গ্রহণ করছেন। মন্দিরটা অনেকটা পুরোনো বাড়ীর মত, একদম কোনার ছোট ঘরে রঘুনাথদাস গোস্বামীর ধ্যানরত মূর্তি, পাশের ঘরে তাঁর পূজিত মূর্তি ছাড়াও আরও কয়েকটি মূর্তি আছে যে গুলিও খুব সুন্দর আর উৎসব উপলক্ষে নতুন পোশাকে আরও সুন্দর লাগছে, উৎসব উপলক্ষে বিগ্রহগুলি সব মন্দিরের বারান্দায় এনে রাখা । সারারাত নামগান করার পর আয়োজকদের চোখেমুখে ক্লান্তি তা সত্ত্বেও তাঁদের প্রসাদ বিতরণ খুবই আন্তরিক ।

আমরা যারা শহরবাসী তারা অনেক রকম মেলা বা উৎসব দেখে থাকি, আমার মনে হয় এখানে একবার এসে দেখতে পারেন এ এক ভিন্ন ধরনের মেলা, চাইলে বাকি সকলের মত পিকনিকে যোগদান করতে পারেন শুধু ঘুরে দেখতেও মন্দ লাগবে না, আর চাইলে বাড়ী ফেরার সময় নিজের পছন্দ মত খানিকটা মাছও কিনে নিতে পারেন।

ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

ছবি : Ayan Mazumder (‘Doorer Sathi’)

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেন
0%
0%
Awesome
Share.

About Author

Address 'Doorer Sathi', Pratyasha Apartment, 64, Pioneer Park, Barasat, India 700124. https://www.facebook.com/doorer.sathi

Leave A Reply