বাবা

বাঙ্গালী বাবা’রা প্রকৃতপক্ষে কি চায়, তা মূলত নিচের এই বাণীর মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।। ”

এই চিরন্তন বানীটি কাব্যে প্রথম ব্যবহার করেন মঙ্গল কাব্য ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (১৭১২ সাল – ১৭৬০সাল)। প্রায় তিন শত বছর আগে রচিত তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে আমরা দেখতে পাই, ঈশ্বরী পাটুনী বা খেয়া ঘাটের মাঝি হলেন একজন সাধারণ বাঙালীর প্রতীক। যার একমাত্র কাজ হল খেয়া বা নৌকায় যাত্রী পারাপার করা। হঠাৎ একদিন অন্নপূর্ণা দেবী কুলবধুর ছদ্মবেশে নদীর কূলে এসে তাকে পার করে দিতে বললেন। নারীকন্ঠ শুনে মাঝি তাড়াতাড়ি ঘাটে নৌকা ভিড়ালেন ঠিকই, কিন্তু একা কুলবধু দেখে প্রশ্ন করলেন,

“একা দেখি কুলবধু কে বট আপুনি।।

পরিচয় না দিলে করিতে নারি পার।
ভয় করি কি জানি কে দেবে ফেরফার।। ”

অর্থাৎ “আপনি দেখছি একা মেয়ে মানুষ,
পরিচয় না দিলে তো পার করে দিতে পারি না।
ভয় লাগে পরে যদি কোন প্যাঁচ (ফেরফার) পড়তে হয়।।”

উত্তরে দেবী বললেন,

“বিশেষণে সবিশেষ কহিবারে পারি।
জানহ স্বামীর নাম নাহি ধরে নারী।। ”

শতশত বছর অতিক্রম করার পরে আমরা জানি, এখনও অনেক বাঙালী নারী স্বামীর নাম মুখে উচ্চারণ করতে লজ্জা পান। যা হোক, একথা বিশ্বাস করে মাঝি বললেন,-

“পাটুনী বলিছে মাগো শুন নিবেদন।
সেঁউতী(নৌকার পানি সেঁচার পাত্র)উপরে রাখ ও রাঙ্গা চরণ।।”

এখানে বাঙালী নারীর রাঙ্গা পায়ের চিরন্তন রুপ সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। যুগে যুগে বহু কবি সাহিত্যিক আলতা পরা নারীর রাঙ্গা পায়ের সৌন্দর্য কে সাহিত্যে উপজীব্য করেছেন। যেমন কবি নজরুল তাঁর গানে লিখেছেন ” লাল টুকটুকে বউ যায় লো লাল নটের ক্ষেতে লো লাল নটের ক্ষেতে।
তার আলতা পরা পায়ের ছোঁয়া……”
এর পর কাব্যের অতিপ্রাকৃত অংশেটুকুতে দেখি যে, কবি লিখেছেন –

“পাটুনীর বাক্যে মাতা হাসিয়া অন্তরে।
রাখিলা দুখানি পদ সেঁউতী উপরে।।
সেঁউতীতে পদ দেবী রাখিতে রাখিতে।
সেঁউতী হইল সোনা দেখিতে দেখিতে।।
সোনার সেঁউতী দেখি পাটুনীর ভয়।
এ ত মেয়ে মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয়।।
তীরে উত্তরিল (আসলো/ভিড়ল)তরী তারা উত্তরিলা।
পূর্বমুখে সুখে গজগমণে চলিলা।।
সেঁউতী লইয়া বক্ষে চলিলা পাটুনী।
পিছে দেখি তারে দেবী ফিরিয়া আপনি।।
সভয়ে পাটুনী কহে চক্ষে বহে জল।
দিয়াছ যে পরিচয় সে বুঝিনু ছল।।
হের দেখ সেঁউতীতে থুয়েছিলা পদ।
কাঠের সেঁউতী মোর হৈলা অষ্টপদ।।
ইহাতে বুঝিনু তুমি দেবতা নিশ্চয়।
দয়ায় দিয়াছ দেখা দেহ পরিচয়।।
তপ জপ জানি নাহি ধ্যান জ্ঞান আর।
তবে যে দিয়াছ দেখা দয়া সে তোমার।।
যে দয়া হৈতে মোর এ ভাগ্য উদয়।
সেই দয়া হৈতে মোরে দেহ পরিচয়।।
ছড়াইতে নারি দেবী কহিলা হসিয়া
কহিয়াছি সত্য কথা বুঝহ ভাবিয়া।।
আমি দেবী অন্নপূর্ণা প্রকাশ কাশীতে।
চৈত্রমাসে মোর পুজা শুল্ক অষ্টমীতে।।
কত দিন ছিনু হরিহড়ের নিবাসে।
ছাড়িলাম তার বাড়ী কন্দলের ত্রাসে।।
ভবানন্দ মজুন্দার নিবাসে রহিব।
ভর মাগ মনোনীত যাহা চাহ দিব।।”

এই অংশটুকু ভাবার্থ করলে দেখা যায় – মাঝীর কথা শুনে দেবী মনে মনে হাসলেন এবং সেঁউতীতে পা রাখলেন,সঙ্গে সঙ্গে সেঁউতী সোনায় পরিনত হল। সেই সোনার পাত্র দেখে মাঝি ভয় পেয়ে গেল আর ভাবলো এ তো কোন সাধারণ নারী নয়, নিশ্চয় কোন দেবী হবে।তীরে এসে যখন খেয়া ভিড়লো দেবী নেমে পূর্ব দিকে ধীরপদে এগিয়ে গেলেন। মাঝি সোনার পাত্রটি বুকে চেপে দেবীকে অনুসরণ করতে শুরু করলে, দেবী নিজেই পিছনে দেখে ফিরে আসেন মাঝির কাছে। মাঝি এবার সাহস করে দেবীকে বললো যে, দেবী নিশ্চয় তাকে মিথ্যা পরিচয় দিয়াছে। মাঝি সোনার পাত্রটা দেবীকে দেখিয়ে বললো যে, “দেখো, তোমার ছোঁয়ায় আমার কাঠের সেঁউতী সোনায় পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এতে আমি বুঝলাম তুমি দেবতা। আমি তপজপ জানিনা, তুমি দয়া করে আমায় যখন দেখা দিয়েছো, আমার সেই সৌভাগ্যের বদৌলতে তুমি তোমার সঠিক পরিচয় আমায় দাও।” তখন দেবী বাধ্য হয়ে নিজের বিস্তারিত বর্ননা দিয়ে মাঝিকে যা খুশি দেবী র নিকট বর চাইতে বললেন এবং এ ও বললেন যে মাঝি যা চাইবে দেবী তাকে তা ই দিবেন।
তার পর দেখা যায়, –

প্রণামীয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে।
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।।
তথাস্ত বলিয়া দেবী দিলা বরদান।
দুধে ভাতে রহিবেক তোমার সন্তান।।

এখানে এসে আমরা সন্তানের জন্য সর্বস্ব ত্যাগী বাঙালী পিতার চিরন্তন যে রুপটি আবিষ্কার করি তা হলো এক জন বাঙালী পিতার সর্ব কালের সর্ব শ্রেষ্ঠ রুপ বা বৈশিষ্ট্য। বাবা দেবীর বর নিয়ে নিজের জন্যকোটি টাকার স্বর্ণ মুদ্রা কামনা করেননি, চাননি নিজের জন্য কোন সুখ -সম্পদ। চিরন্তন বাঙালী পিতা নিজের জীবনের চাওয়া পাওয়া আর সুখ শান্তির চেয়ে যে সন্তানের সুখ শান্তি কামনা করেন তা সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। তিন শত বছর পরে এসে তাই আজো কামনা করি ” আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।”

~সংগৃহীত

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেন

পাগলের প্রলাপ

আমার নিঃশব্দ কল্পনায় দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি, আমার জীবনের ঘটনা, আমার চারপাশের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে লেখার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষেরই ঘন কালো মেঘে ডাকা কিছু মুহূর্ত থাকে, থাকে অনেক প্রিয় মুহূর্ত এবং একান্তই নিজস্ব কিছু ভাবনা, স্বপ্ন। প্রিয় মুহূর্ত গুলো ফিরে ফিরে আসুক, মেঘে ডাকা মুহূর্ত গুলো বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ুক। একান্ত নিজস্ব ভাবনা গুলো একদিন জীবন্ত হয়ে উঠবে সেই প্রতীক্ষাই থাকি।

Create Account



Log In Your Account