পীর একদিল শাহ ও জাহাজ ডুবির গল্প

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

পীর একদিল শাহ ও জাহাজ ডুবির গল্প ~ লেখক ঃ কাজি সাদেক উল্লাহ্‌

সুবৰ্ণরেখা নদী আনোয়াপুর পরগণার মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুদূর বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। তৎকালে উক্ত নদীবক্ষে ছোট-বড় অনেক জাহাজ চলাচল করত। (তখন বৃহদাকার নৌকাকে জাহাজ বলে অভিহিত করা হত।) বোঝাই মালপত্তর নিয়ে তারা গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা দিত, আবার জাহাজ ভৰ্ত্তি মাল পত্তর নিয়ে এই নদীর বক্ষ বেয়ে দেশাভিমুখে প্রত্যাগমন করত। তৎকালে এই নদীর বুকে যেমন জাহাজের আনাগোনা চলত তেমনি নদীর কিনারা বরাবর মাঝে মাঝে দাসু্যদলের উৎপাতও দৃষ্টগোচর হত। – খুব বেশী দিনের কথা নয়, আজ হতে মাত্র বছর সতের পূৰ্ব্বের ঘটনা, তখন আমি ত্ৰয়োদশ অতিক্রম করেছি কি করি নাই বা চতুর্দশের প্রথমাবস্থায়। এমনি একদিনে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে চিরাচরিত অভ্যাসমত শালিকাদহ বা শেলকেদায় শুকনা ঘাসের উপর বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভাবছি। সন্নিকটে মাটি কাটার দল পুষ্করিণীর তৈরীর কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ আমরা দেখতে পেলাম বেশ কয়েকজন লোক কি যেন একটা জিনিষকে নিয়ে নিরীখা করছে। কৌতুহলবিষ্ট হয়ে বস্তুটিকে চক্ষুপটে অঙ্কিত করার নিমিত্ত কিছুটা অগ্রসর হলাম, কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম জীর্ণ অথচ বৃহদাকার একটি লোহার টুকরাই ছিল নিরীক্ষণের বস্তু। কৌতুহল বেড়েই চলল- অত নীচুতে এত পুরু লোহা কোথা হতে এল, এই ছিল আমাদের চিন্তার বিষয়বস্তু। পরে জানতে পারলাম, আটশ বছর পূর্বে শালিকদহে যে সাতটি জাহাজ ডুবি হয়েছিল, উক্ত লোহাটি ঐ জাহাজেরই অংশ বিশেষ। জাহাজ ডুবি! আশ্চৰ্য্য হয়েছিলাম, কৌতুহলবিষ্ট হয়ে জাহাজ ডুবির যে চিত্তাকর্ষক কাহিনী শ্ৰবণ করেছিলাম, সেই কাহিনীই আজ আগ্রাহান্বিত পাঠক-পাঠিকার সম্মুখে তুলে ধরছি।

বালক আর বালক নহে, যৌবনে উপনীত হয়েছেন। গরু চরাবার দায়িত্ব আর তার স্কন্ধে রাখেননি ছোটোমিয়া তাই তখন, আল্লাহ পাকের এবাদতে তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করতেন, শালিকদহের সন্নিকটে তিনি প্রায়ই বসে আল্লাহপাকের ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। একদিনের ঘটনা, আধ্যাত্মিক শক্তির বলে তিনি জানতে পারলেন, সাতখালি গ্রামে একদল সশস্ত্র দস্য লুটতরাজের অপেক্ষায় নদীর বক্ষে বড় বড় চেন ফেলে কাৰ্য্যসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখতে পেলেন দক্ষিণ দিক হতে সাতটি জাহাজ নোঙর তুলে বোঝাই মালপত্তর নিয়ে সাতখালির দিকে যাত্রা করছে। জাহাজ ঘাটে এসে ভিড়লে, তিনি জাহাজের সারেঙকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘সম্মুখে তোমাদের মহাবিপদ”। তার মুখে এই কথা শ্রবণ করে সারেঙটি সহাস্যজনিত স্বরে কইল, “কোন ওখানে গেলে তুফানে পড়ে জলের তলে তলিয়ে যাব নাকি ?’ সারেঙটি তাহার সহিত রহস্য করছে বুঝতে-পেরে তিনি কোমল হৃদয়ে ব্যথা অনুভব করলেন। তবুও বিনীতস্বরে কইলেন, “না তুফান না, একটু আগে সশস্ত্র দসু্যদল তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সংখ্যায় তারা একশ জনেরও বেশী।” এবার সারেঙটির হৃদয় ভয়ে ভীত হয়ে উঠল, সে ভীতস্বরে জিজ্ঞাসা করল, “এখন তা হলে উপায় ?” তিনি সারেঙটিকে কইলেন, “আমি তোমাদের জাহাজ নির্বিঘ্নে পার করে দেব, কিন্তু একটা সর্তা।” সারেঙ জিজ্ঞাসা করল, “কি সর্ত তোমার ?” “জাহাজের মধ্যে একটি শালিক পাখি ছিল, তিনি ঐ পাখিটির দিকে অঙ্গুলি নিৰ্দেশ করে বললেন, ঐ পাখিটি আমার চাই।” সারেঙটি হাঁ বাচক বাক্য ব্যবহার করে তখনকার মত নীরব হল। – তিনি কালবিলম্ব না করে জাহাজে উঠলেন ও জাহাজ ছাড়তে আদেশ করলেন। তার আদেশ পেয়ে জাহাজগুলি পুনরায় তাদের স্থির মূৰ্ত্তিকে পরিবর্তনের প্রয়াস পেল। কিয়ৎদূর অগ্রসর হয়ে সকলে দেখতে পেল, সাতখালির নিকটে একদল সশস্ত্র দস্য তাদের লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শিকারের আশায় অপেক্ষা করছে। যেখানে দাসু্যরা অপেক্ষা করছে, জাহাজ তার নিকস্থ হলে তিনি হাতের ইশারার দ্বারা “বিসমিল্লাহ” বলে অন্য দিকে ইঙ্গিত করলেন। পাশের শুকনা জমি নদীতে রূপান্তরিত হল। সুবর্ণরেখা নদীর। পাশ দিয়ে এই নদীটি তৈরী হয়েছে বলে এটির নামকরণ হল পাশখালি।

একই নদী দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে কয়েক ক্রোশ দূরে গিয়ে পুনরায় মিলিত হল। মাঝখানে পড়ে রইল বিরাট চর। দুই নদীর মধ্যস্থলে এই ভূমিখন্ডে অবস্থিত গ্রামটি বর্তমানে ‘বন্দর আটী’ নামে পরিচিত। যাই হোক জাহাজটি নির্বিঘ্নে বিপদসীমা অতিক্রম করল। এবার তিনি সারেঙটিকে উদ্দেশ্য করে কইলেন, “কই এবার দাও আমাকে পাখি।” কিন্তু কার্যসিদ্ধির পর সারেঙ তাকে পাখিটি দিতে অস্বীকার করল। সে বলল, “পাখিটিকে আমি দিতে পারব না, এর পরিবর্তে তুমি যা চাও আমি তাই দিতে রাজী আছি। বল তোমার কত টাকার প্রয়োজন ?” তিনি বললেন, ‘টাকা নিয়ে আমি করব কি? আর টাকারই বা আমার প্রয়োজন কিসের ? তোমার প্রতিশ্রুত জিনিসটিরই আমার প্রয়োজন, আমার ধনরত্নের প্রয়োজন কিসের” তথাপিও সারেঙ তাকে পাখিটি দিতে অস্বীকার করল। তিনি অধিক বাক্যব্যয় না করে পুনরায় শালিকদহের কাছে এসে খোদার চিস্তায় বিভোর হলেন। দেশাভিমুখে প্রত্যাগমনকালে শালিকদহের ঘাটে এসে তার রাগান্বিত মূৰ্ত্তিটির পরিবর্তনের প্রয়াস পেল। ইতিপূর্বে তিনি দিব্যচক্ষুর সাহায্যে বুঝতে পারলেন, জাহাজগুলির প্রত্যাগমনের কথা। তাই তিনি নির্দিষ্ট সময়ের কিছু পূর্বে ঘাটে এসে পৌঁছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতিবধ্য সারেঙটির সম্মুখীন হয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “কই দাও আমার পাখি।” এবার সারেঙটি বিস্ময়বোধক বাক্যে বলল, “কিসের পাখি তোমার?” কথাটার পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি, কিসের পাখি তোমার! জননা কিসের পাখি আমার ?’ অতঃপর সারেঙটি নিজের মনে বলল, “কোথাকার পাগল এ লোক!” এতবড় বিপদ হতে যাদের তিনি উদ্ধারের পথ করে দিতে সহায়ক হলেন, তারাই কিনা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তাকে পাগল বলে অভিহিত করছে! তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না, র্তার কোমল হৃদয় পাথরে পরিণত হল। জাহাজগুলির ঘাট হতে কিয়ৎদূর অগ্রসর হলেই তিনি তার হাতের যষ্ঠি দ্বারা তিনবার মাটিতে আঘাত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে সাতটি জাহাজই অতল পানিতে তলিয়ে গেল, আর জাহাজে রক্ষিত শালিক পাখিটী তার মস্তকে আশ্রয় নিল। পাখিটীকে তিনি অত্যাধিক ভালবাসতেন। তার মৃত্যুর পর পাখিটিকে তীর পদতলে সমাধিস্থ করা হয়।

পীর একদিল শাহের দরগাহ হল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণার বারাসতের কাজীপাড়ায় অবস্থিত পীর হজরত একদিল শাহের পবিত্র মাজার শরীফ। সৌধসদৃশ ও প্রাচীরবেষ্টিত কাজীপাড়ার এই দরগাহে প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত থেকে পরের আটদিন একদিল শাহের স্মরণে উৎসব পালিত হয়। তাছাড়া, প্রতি শুক্রবার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ প্রার্থনা জানাতে ভিড় করেন।

চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকে পীর গোরাচাঁদের (সৈয়দ আব্বাস আলী) সঙ্গে যে একুশজন পীর-আউলিয়া সৌদি আরব থেকে দক্ষিণ বাংলায় ইসলাম ধর্মপ্রচারে আসেন, হজরত একদিল শাহ ছিলেন তাদের অন্যতম। চব্বিশ পরগণার আনোয়ারপুর পরগণা ছিল তাঁর ধর্মপ্রচারের স্থান। এখানকার বারাসতের কাজীপাড়ায় ছুটি খাঁর বাড়িতে তিনি থাকতেন। তাঁর সরল ধৰ্মমত ভারতীয় ভাবানুকূল ছিল, এজন্য তিনি বেশ প্রতিপত্তিশালী হয়েছিলেন। কোনও এক পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। স্থানীয় লোককাব্যে পীর একদিল শাহের রূপ বর্ণিত হয়েছে এইভাবে:

উপনীত হইল পীর রাজ-দরবারে
আকাশের চন্দ্র নামিল ভূমেতে…
কাল মেঘের আড় বিজলীর ছটা
কাঁচা সোনা জ্বলে যেন সানিরের বেটা
দু আঁখে কাজল অতি দেখিতে উত্তম
চলন খঞ্জন পাখি পাইবে শরম
হাতে পদ্ম পায় পদ্ম কপালে রতন জ্বলে
পীরকে দেখিয়া প্রজা ধন্য ধন্য করে।

পীর একদিল শাহের সমাধি দরগাহে পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত থেকে তাঁর মৃত্যুর দিন স্মরণ করে প্রতি বছর আটদিন ব্যাপী বিশেষ উৎসব ও মেলা হয়।মেলায় কাওয়ালি তরাণা, মানিকপীরের গান, নানারকম বাজনা, পুতুলনাচ ও ফকির-দরবেশের ধুম লাগে। কথিত আছে, রাজা রামমোহন রায়ের প্রপৌত্র এখানে খুব সকালে এসে শিরনি দিতেন৷ পরবর্তীতে, পীরোত্তর ভূমিদানের ফলে রামমোহনের সেরেস্তার তরফ থেকে শিরনি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। এই দরগাহে সকলের আগে হিন্দুদের শিরনি দেওয়ার রীতি আছে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের ভক্তরা ফুলপাতা দেন খাদিমদারের হাতে এবং পীরের প্রসাদ ও শান্তিবারি লাভ করেন। ভক্তদের মধ্যে ‘পীরের লুট’ দেওয়ার রীতিও আছে।

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেন
Share.

About Author

আমার নিঃশব্দ কল্পনায় দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি, আমার জীবনের ঘটনা, আমার চারপাশের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে লেখার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষেরই ঘন কালো মেঘে ডাকা কিছু মুহূর্ত থাকে, থাকে অনেক প্রিয় মুহূর্ত এবং একান্তই নিজস্ব কিছু ভাবনা, স্বপ্ন। প্রিয় মুহূর্ত গুলো ফিরে ফিরে আসুক, মেঘে ডাকা মুহূর্ত গুলো বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ুক। একান্ত নিজস্ব ভাবনা গুলো একদিন জীবন্ত হয়ে উঠবে সেই প্রতীক্ষাই থাকি।

Leave A Reply