একটি রূপকথার গল্প – অভীক দত্ত

একটি রূপকথার গল্প

একটি শরতের রবি সকাল।
আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ। কাশ ফুল ফুটেছে।
গাছে গাছে পাখি ডাকছে।
পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা জোরে জোরে নামতা মুখস্ত করছে। রাস্তা থেকে সে শব্দ শোনা যাচ্ছে।
হিরুবাবু বাজারে এসেছেন। কার্তিকের দোকান।
গরম গরম রাধাবল্লভী আর ঘুগনি। ঘুগনির ওপরে ছড়িয়ে থাকে পরম যত্নে কুচি কুচি করে কাটা পেঁয়াজ। প্রথমে একটা রাধাবল্লভী পড়ে পাতে।
ফুলে থাকে। একটু ফুঁ দিতে দিতে খেতে হয়।
সেটা শেষ হতে না হতেই কার্ত্তিক আরেকটা রাধাবল্লভী দেয়।
এদিকে দুটো রাধাবল্লভী খেতে খেতেই ঘুগনিটা শেষ হয়ে যায়। একটু হাঁক পাড়তেই কার্ত্তিক হাতা দিয়ে আরও ঘুগনি ঢেলে দেয় বাটিতে। সাথে পেঁয়াজ কুচিও। এরপরে রাধাবল্লভীর কিস্তি আসে দুটো করে। চারটে খাবার পরেও হিরুবাবু বুঝতে পারেন পেটের এক কোণাও ভরে নি। কার্ত্তিকও বোঝে সেটা। না বলতেই আরও তিনটে পড়ে যায় পাতে। ঘুগনিও।
হিরুবাবু সেগুলোর সদ্গতি করে ফেলেন তাড়াতাড়ি। ওদিকে কুচো লঙ্কা, পেঁয়াজ দিয়ে একটা ডবল ডিমের অমলেট গোকুলে বাড়ছিল। সেটাও পড়ে গেল পাতে। শেষ কচুরিটা হিরুবাবু অমলেট দিয়ে খান। ভুল বলা হল। অর্ধেক অমলেট লাগে কচুরিটা শেষ হতে। বাকি অর্ধেকটা একটু একটু করে তরিবৎ করে খান। পারুলের জিলিপির দোকান পাশেই। হিরুবাবুকে খেতে দেখেই জিলিপিরা তৈরী হয়।
অমলেট শেষ হতেই পাতে পড়ে নিক্তিতে ভাজা জিলিপি। লাল কিন্তু লাল নয়, কালো কিন্তু কালো না, মুখে দিলে গলে যায়।
খাওয়া শেষ হলে হিরুবাবুর ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি ফোটে। কিন্তু হাসিটা পূর্ণ হয় না।
ব্যাগ দুলিয়ে হিরুবাবু এবার রুস্তমের দোকানে যান। লাইন থাকে একটু। হিরুবাবু লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে তীক্ষ্ণ চোখে ঝোলানো খাসিটার অ্যানাটমি অ্যানালিসিস করতে থাকেন। কোন অংশটা তার প্রয়োজন। তার সময় এলেই রুস্তমের মুখে হাসি খেলে যায়, “বলুন হিরুবাবু, কোত্থেকে দেব?”
হিরুবাবু গম্ভীর মুখে বলেন “পায়ের দিকটা থেকে দে। চর্বি দিবি না কিন্তু বলে রাখলাম”।
রুস্তম ঠিক হিরুবাবুর কথামত মাংসটা কেটে দেয়। মাংসটা নিয়ে হিরুবাবুর মুখের হাসিটা একটু দীর্ঘ হয় কিন্তু পূর্ণতা পায় না।
রুস্তমের দোকান থেকে বেরিয়ে হিরুবাবু বাড়ি চলে আসেন। গিন্নিকে ব্যাগটা হ্যান্ড ওভার করে খবরের কাগজটা নিয়ে বসেন। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেই পাড়ার পুজোর প্যান্ডেল দেখা যাচ্ছে।
দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ একটা বাটিতে দু পিস মাটন। টেস্টের জন্য। নুন ঝাল ঠিক আছে নাকি দেখাটা কর্তব্য যখন।
প্রথম পিসটা মুখে দিয়েই হিরুবাবু বুঝে যান সেই একটু নুন দিতে হবে। সেদ্ধটা চমৎকার হয়েছে। গিন্নিকে বলে দেন নুনের কথা।
স্নানে চলে যান। স্নান থেকে ফিরেই গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, আলু পোস্ত ভাজা, মুসুরির ডাল, আর পাতের কোণে লজ্জাবতী লতার মত খাসীর বাটিটা থাকে।
হিরুবাবু মাথা মুছতে মুছতেই বসে পড়েন। আলু চৌকো চৌকো করে কাটা, তার ওপর পোস্ত ছড়িয়ে ভাজা। ভাতটা ভেঙে শুকনো আলু পোস্ত ভাজা দিয়ে একটু একটু করে ভাত খান আর মাংসের বাটিটার দিকে তাকান। একটা গন্ধ ভেসে আসে নাকে। মনটা উদাস হয়ে যায়। হিরুবাবুর ছেলে নন্তু পাড়ার মাঠ থেকে ফুটবল খেলে আসে। বাবাকে খেতে বসতে দেখে চেয়ার টেনে বসে যায়। গিন্নি বলেন “স্নান করবি না?”
হিরুবাবু বোঝেন ছেলে তার মতই হয়েছে। পিতৃস্নেহে অন্ধ হয়ে হেসে বলেন “ওকেও দিয়ে দাও”।
নন্তু খেতে বসে। হিরুবাবু ভাতে মাংসের ঝোল মাখেন। হাত দিয়ে একটা একটা করে পিস নিতে নিতে আড়চোখে দেখেন নন্তুর বাটিতে কি মাংস কম গেছে? ছেলেকে উদার কন্ঠে বলেন “আমার বাটি থেকে এক পিস নে তো বাবা”।
ছেলে বাবার বাটি থেকে লজ্জা লজ্জা মুখ করে এক পিস তুলে নেয়। গিন্নি বলেন “আমাকে বললেই হয়, মাংস আছে তো”।
হিরুবাবু বলেন “তুমি আবার এত হ্যাপা করছ কেন? খেতে বস তো! উফ!”
গিন্নি বলেন “না না ,তোমরা খেয়ে নাও”।
নন্তু মায়ের হাত ধরে জোর করে খেতে বসিয়ে দেয়। হিরুবাবুর মাংস শেষ হয়ে গেছে, গিন্নিকে বলেন “নন্তুকে আরও মাংস দাও”।
গিন্নি বোঝেন ছেলের নামে আসলে বাবাই খেতে চাইছেন। বাপ ছেলে দুজনের পাতেই পড়ে তিন পিস করে। খাওয়া শেষ হতে হিরুবাবুর চোখে তৃপ্তির জল আসে। গিন্নিকে বলেন “ওগো, মনটা কেমন মিষ্টি মিষ্টি করছে। ওই ক্ষীরকদমটা ছিল না ফ্রিজে?”
নন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে ফ্রিজ থেকে ক্ষীরকদমের প্যাকেটটা বের করে।
ছটা অবশিষ্ট ছিল। মিষ্টির সম বন্টন হয়। কিন্তু গিন্নি একটা ক্ষীরকদম হিরুবাবুর পাতে দিয়ে দেন। হিরুবাবু আর না বলতে পারেন না।
খাওয়া শেষে হিরুবাবু ঘরে গিয়ে জানলাটা খুলে দেন। একটা দখিণা বাতাস বইছে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েন খেয়ালই থাকে না।
বিকেল হতে হাঁটতে বেরনো। প্রায় ঘন্টাখানেক হেঁটে হিরুবাবু বাজার যান। নিধু ময়রা গরম গরম রসগোল্লা নামাচ্ছে। হিরুবাবুকে দেখেই প্লেটে দুটো চলে আসে। গরম রসগোল্লা নরম থাকে। গোল থাকে কিন্তু একটু বেড়ে থাকে। চামচ দিয়ে সে রসগোল্লার সঙ্গে একটা হালকা খেলা চলে। রোনাল্ডিনহোর ড্রিবল যেমন। মুখে যখন রসগোল্লা উঠে আসে তখন চোখ বুজে আসে। নিধুকে অনেক আশীর্বাদ করেন হিরুবাবু। ফেরার পথে গিন্নি আর নন্তুর জন্য গরম সিঙ্গারা আর রসগোল্লা নিয়ে ফেরেন।
বাড়িতে গিন্নিকে সে প্যাকেটখানি দিতেই গিন্নি মুড়ি দিয়ে সিঙ্গারা মেখে দেন। বাটির মধ্যে একখানি আস্ত সিঙ্গারাও থাকে। চামচ দিয়ে হিরুবাবু মুড়ি খাওয়া শুরু করেন। কিন্তু পরক্ষণেই গিন্নির চমৎকার মুড়ি মাখা দেখে নিজেকে সামলাতে না পড়ে হিরুবাবু হাত দিয়েই সে মুড়ির সদ্গতি করেন। শেষ পাতে আবার রসগোল্লা। খাওয়া হয়ে গেলে হিরুবাবু টিভি চালান। বাবা ছেলে মা মিলে টিভি দেখেন।
রাত্তিরে খাসীর আলু দিয়ে ঝোল। আমেরিকা আবিষ্কারের মত পাতে দু এক পিস মাংসের ছাঁট পড়ে। হিরুবাবু পরম তৃপ্তিভরে সেটা খেয়ে নেন।
খাওয়া শেষে বাড়ির বাইরের আরাম কেদারায় একটু বসেন হিরুবাবু। হাওয়া দেয় মলয় বাতাস, হিরুবাবু চোখ বুজে ভাবেন জীবনটা এত মধুর কেন…

(সম্পূর্ণ কাল্পনিক গল্প, প্রেশার সুগার কোলেস্টেরল ভরা দুনিয়ার সঙ্গে এই গল্পের কোন মিল নেই)

Source

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেন

পাগলের প্রলাপ

আমার নিঃশব্দ কল্পনায় দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি, আমার জীবনের ঘটনা, আমার চারপাশের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে লেখার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষেরই ঘন কালো মেঘে ডাকা কিছু মুহূর্ত থাকে, থাকে অনেক প্রিয় মুহূর্ত এবং একান্তই নিজস্ব কিছু ভাবনা, স্বপ্ন। প্রিয় মুহূর্ত গুলো ফিরে ফিরে আসুক, মেঘে ডাকা মুহূর্ত গুলো বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ুক। একান্ত নিজস্ব ভাবনা গুলো একদিন জীবন্ত হয়ে উঠবে সেই প্রতীক্ষাই থাকি।

Create Account



Log In Your Account