অরূপ তোমার বাণী : পর্ব ৩

Sudeshna Chakraborty

আমার বড় কন্যা বাবলি অনেক দেরীতে হাঁটতে পেরেছে , দেরীতে কথা বলেছে । অন্য বাচ্চাদের তুলনায় দাঁত ও উঠেছে বেশ পরে । আমি একসময় খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম , ওর আদৌ দাঁত উঠবে তো ? চন্দননগরে ওর ডাক্তার বাবু আমায় হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিলেন ,

” কোনো দাঁত না ওঠা মানুষের কথা আপনি শুনেছেন কি ?”

আমার স্বতস্ফূর্ত উত্তর ছিল ,

” শুনিনি ,তবে পড়েছি । শরদিন্দু তাঁর ” তুঙ্গভদ্রার তীরে উপন্যাসে “রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের এক রানীর কথা বলেছেন । তিনি দন্তহীনা তাই অসূর্যম্পশ্যা ছিলেন ।”

শুনে ডাক্তার বাবু আমার দিকে অ্যায়সা বিরক্তির চোখে তাকিয়েছিলেন , যে পরে আমার আর সাহস হয়নি শুধোতে , মেয়ে হাঁটতে পারবেতো ? কথা বলতে পারবে তো ?

বাবা বলেছিলেন ,

” এ বেটি ওর মায়ের মতো । দেখবি হাঁটবে না একেবারে নাচবে । আর যখন কথা বলতে শুরু করবে তখন তুই ই ওকে থামানোর জন্য অস্থির হয়ে যাবি ।”

বাবার ভবিষ্যদ্বাণী পরে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হলেও তখনও বাবলির শব্দভাণ্ডার মাত্র “ইজ্জে” , “উজ্জে”, “পাপা” ,” দাদা” , “মা” আর “বু ” এর মধ্যেই সীমিত । আমার মা কে ও “মা ” আর আমার বুড়ু নামের সংক্ষেপ করে আমায় “বু” ডাকত ।

বাবলিকে কথা বলানোর জন্য আমি ওর সাথে অনর্গল বকে যেতাম । সেসব বুকনি কিন্তু মোটেই , “আ বুজুবুজু ” , “অলুগুলুগুলু ” এরকম হিজিবিজি কথা নয় । একদম পরিষ্কার বাংলা ভাষায় প্রতিদিনের প্রোয়োজনীয় সংলাপ । তার সাথে “ছড়ার ছবি” , “আবোল তাবোল ” , “শিশু ” থেকে কবিতা শোনাতাম , নানান অঙ্গ ভঙ্গিমায় । ফল যেটা হল , আমার কন্যা , হাঁটার আগেই বসে বসে নাচতে শিখল , সব কটি ছড়া , কবিতা মুখের অভিব্যক্তিতে এবং হাতের মুদ্রায় সুন্দর করে দেখিয়ে জনগনের বাহবা পেতো । কিন্তু একটিও বাড়তি শব্দ বলে আমার প্রচেষ্টাকে সার্থক করার কোনো রকম আগ্রহ দেখাতো না । এদিকে তিনি বোঝেন সব । বরং ঐ বয়সে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশীই বোঝেন । ওর বাবার সাথে আমি ঝগড়া করলে তিনি তৎক্ষণাৎ খাওয়া থামিয়ে দিয়ে আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকেন। কিম্বা তার বাপের কোল থেকে আমার কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালে বাঁই করে আমার দিক থেকে মুখ ঘুড়িয়ে নেন । দেখে সর্বাঙ্গ জ্বলে যায় ।

সেদিন কিছু মুদির জিনিষ কেনার আছে , বিশেষতঃ ঘরে চাল বারন্ত । আর এই কথাটি আমার স্বামীকে বললে , অফিস থেকে ফিরে ভারী চেঁচামিচি শুরু করে দেবে । ও এই ” নেই, এক্ষুনি আনতে হবে , নইলে সেইদিনের খাওয়া জুটবে না ” ব্যাপারটা একদম নিতে পারে না , আর আমি কারুর মেজাজ সহ্য করতে পারিনা । তখনো সংসারে গিন্নী হয়ে উঠিনি । আর আমার মায়ের রান্নাঘরে মুদির জিনিষ, মশলাপাতি সব কম করে ঠোঁঙায় ঠোঁঙায় থাকে ।ফুরিয়ে গেলে , পাড়ার দোকান থেকে আবার আসে । আমার দিদার আবার উল্টো ছিল । উত্তরপাড়ার ভাড়া বাড়ী ছেড়ে মেজোমামার কাছে রাউরকেল্লায় যাওয়ার সময় নাকি , তাঁর সঞ্চয় থেকে পাঁচ কেজি ঘুগনিমটর , আর এক কেজি কাজু বেরিয়েছিল । বহুকালের যৌথ পরিবারে থাকার দরুন মাত্র তিন জনের সংসারে কমপরিমানের ভাঁড়ারে তিনি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন নি ।

আমার মা অসম্ভব ভালো রান্না করলেও কোনোকালেই খুব গোছানো গৃহিণী ছিলেন না । বরং আমার শাশুড়ী মায়ের কাছেই আমি সংসারের অনেক কিছুর তালিম পেয়েছি । সে সব নিয়ে “গৃহিনীপনার খুঁটিনাটি ” বলে একখানি চটি বই আমি অনায়াসে লিখতে পারি । কিন্তু ঐ যে বলমাম , তখনো সংসারে ঠিক দড় হয়ে উঠতে পারিনি । তবে শ্বশ্রুমাতার অনুকরণে আমার ছোট্ট গেরস্থালীতে বাসন কোসন , কৌটো কাওটা, এবং রাজ্যের মশলাপাতির কিন্তু অভাব ছিল না। বরং মাত্র কয়েকমাস পর , গান , নাচ , লেখা শিকেয় তুলে আমি ঘোরতর সংসারী হয়ে পড়েছিলাম বলে আমার মা যারপরনাই অপ্রসন্ন হয়েছিলেন। ধ্যাৎতারি । আমি বড্ড ধান ভাঙ্গতে শিবের গীত গাইছি । কোনো মানে হয় !

তখন রোজ বিকেল হতেই বাবলিকে প্র্যামে বসিয়ে বেড়াতে যেতে হত । তার দাদু এই বদ অভ্যাস টি করিয়ে দিয়ে গেছেন । একে হাঁটতে আমার মোটে ভালো লাগে না , তারপর রাত বারোটায় শুয়ে রোজ ভোর পাঁচটায় উঠে সংসারের কাজ । ঠিক দুপুর পেরোলেই আমার তেড়ে ঘুম পেতো । আর তখনই এই চক্রবর্তীর মেয়ের বেড়াতে যেতে হবে ।

সেদিন ভাবলাম , দুপুরের রোদে আর বেরোই কেন , বিকেলে মেয়েকে নিয়ে বেড়ানোর সময় একেবারে “হাজা” এর দোকান হয়ে আসব । বিকেলবেলা বাবলিকে খাওয়ানোর সময় বললাম ,

” দ্যাখ , আমি আজ হাজা র দোকানে জিনিষ কিনতে যাব । তুই কোলে উঠতে চাইবিনা তো ? যদি লক্ষ্মী হয়ে প্র্যামে বসে আসিস , তাহলে ললিপপ দেবো । আর যদি কোলে উঠেছ , তাহলে ঐখানেই রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে আসব । বল , কোলে উঠবি না তো ? ”

কন্যা আমার , তার বৈকালিক জলখাবার সুজির পায়েস খেতে খেতে চোখ বিস্ফারিত করে প্রবল বেগে দু পাশে ঘাড় নাড়লে । আমি নিঃশ্চিন্ত হয়ে মেয়েকে সাজিয়ে গুজিয়ে , থলে টলে নিয়ে বেরোলাম ।

হাজা র দোকানে পৌঁছে আলির সাথে দেখা । সৈয়দ মোবারক আলি মেদিনীপুরের ছেলে , শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ার , সিন্টার প্ল্যান্টে দাদার দু’ বছরের জুনিয়ার । আমার থেকে বছর দু তিন ছোটোই হবে । দাদার ফ্ল্যাটে আলি প্রায়ই আসে । বাবলি ওকে খুব পছন্দ করে ।

আলি হাত বাড়াতেই বাবলি আলির কোলে উঠে যেন ধন্য করল । আলি ওর হাতে একখানা ললিপপ কিনে দিতেই , সে সেখানা আমাকে দেখালে , আমি হেসে ওকে বললাম ,

“পরে খেয়ো ।”

আমার বাধ্য মেয়ে ললিপপ হাতে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দোকানের এদিক ওদিক দেখতে দেখতে , ততক্ষণে “ইজ্জে” ,” উজ্জে” করছে । আমি প্রমাদ গুনলাম , আলি ওকে আরো যদি কিছু কিনে দেয় ! দোকানে কি বাচ্চাদের লোভনীয় বস্তুর অভাব আছে? তাড়াতাড়ি জিনিষ পত্র থলেতে ভরে বললাম ,

” আসি রে , আলি ।”

আলি আমার হাতে অত ভারী ভারী মালপত্র দেখে বললে ,

” তুমি মুদির জিনিষগুলো প্র্যামে বসিয়ে নিয়ে যাও , আমি বাবলিকে নিয়ে বাইকে করে পৌঁছে দিয়ে আসছি । ”

খুব ভালো প্রস্তাব । আমি সেইমতো প্র্যামে দুই থলেভর্তি জিনিষপত্র চাপিয়ে নিলাম । বাবলিকে নিয়ে আলি বাইকের দিকে যাবার আগেই মেয়ে তার হাতের ললিপপ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে , ঝাঁপিয়ে আমার কোলে চলে এল । শুধু এলো না , আমার কাঁধে মুখ রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল । আমার হঠাৎ মনে পড়ল , সেদিন সকালে বাবলিকে একটু বেশী শাস্তি দিয়ে ফেলেছি ।

বাবলি তখন, হাঁটতে পারে না , কিন্তু চার হাতে পায় , মাটিতে হাঁটু না ঠেকিয়ে এক অদ্ভুত কায়দায় হামা দেয় । এবং প্রায় প্রতিদিন ই হয় বাসন মাজার সাবান চেটে দেখা , বা তার জিঠানের ঘরে ঢুকে ধারালো ব্লেড নিয়ে মুঠো করে হাত রক্তাক্ত করার মতো নানান উদ্ভাবনকারী কার্য করে থাকেন । এদিকে তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিলে কোনো অবলম্বন ছাড়াই দিব্য দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন । অথচ এক পা ও হাঁটেন না , বা বসেও পরেন না । ওর উপর রাগ হলেও ঐ হাড় জিরজিরে শিশুকে দু ঘা দিতে আমার বড় মায়া হত । যদিও পরবর্তীকালে বেচারি আমার কাছে বেধড়ক ধোলাই খেয়েছে , আজ ওকে ছেড়ে তাকতে গিয়ে , সেসব দিনের কথা মনে করে মন টা হু হু করে ওঠে । কিন্তু সেই সময় ওর একমাত্র শাস্তি ছিল ঘরের মাঝখানে ওকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া । বাবলি বসতে ভয় পেতো । কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে , বিনা কান্নায় মায়ের শাস্তি গ্রহণ করত ।

ও তো বরাবর এমন ই । অনেক পরে আমি নাচের স্কুল করে ফিরে এসে যখন দেখতাম , আমার দুই মেয়ে সন্ধ্যে সাতটায় তাদের বাপের সঙ্গে বসে টিভিতে ডিসকভারি চ্যানেল দেখছে , তখন আমি একটি হুংকার ছাড়লে , মিতুল তাড়াতাড়ি হোম ওয়ার্ক করতে বসে যেত , আর বাবলি রান্নাঘরে আমার পিছন পিছন ঘুরে ঘুরে বকুনি খেতো । যখন আর একটি হুংকার ছাড়তাম,

” পড়তে না বসে , আমার পিছন পিছন ঘুরছিস কেন ? ”

উত্তরে আমার অতি বাধ্য মেয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলত ,

” বকুনি না শুনলে তো তুমি বকবে ।”

শুনে বিশ্বাস করুন, মনে হত , নিকুচি করেছে মেয়ের ভালো রেজাল্টের । ওকে বুকে জাপ্টে ধরে আদর করতে ভারী ইচ্ছে হত । কিন্তু আমার মধ্যে কর্তব্যনিষ্ঠ উগ্রচণ্ডী মাতৃস্বরূপের কাছে মমতাময়ী জননী বরাবরই হেরে ভূত ।

সেদিন বাবলিকে ফাঁকা হলে দাঁড় করিয়ে রাখার সময়টা বোধহয় একটু দীর্ঘ ই হয়েছিল । একরাশ জামাকাপড় কাচতে কাচতে আমার খেয়াল ছিল না । খানিক বাদে মেয়ের কান্না শুনে ছুট্টে গিয়ে কোলে তুলে আদর করেছিলাম বটে কিন্তু মায়ের এই নিষ্ঠুরতা নিশ্চয়ই শিশুমনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল । একে এই অপরিচিত পরিবেশে আচমকা আসা , যেখানে ওর “মা” নেই , পরিচিত অন্য কেউ নেই । “দাদা” ছিল , কিন্তু কোথায় চলে গেল । “পাপা” প্রায় দিন ই ওর ঘুম থেকে ওঠার আগে কোথায় উধাও হয়ে যায় । ফেরে দিনের আলো মুছে যাবার পর । আছে শুধু একমাত্র এই “বু” । সেও ওকে কার কাছে ছেড়ে চলে যাবে ?

সেই মুহূর্তে আমার গলার কাছটাও কেমন ব্যথিয়ে উঠল । আলি কে বললাম,

” থাক রে ,ও বড্ড কাঁদছে । তুই বরং আমার থলে দুটো যদি একটু পৌঁছে দিস , খুব উপকার হয় ।”

আলি কম কথার মানুষ । সে সঙ্গে সঙ্গে আমার ভারী ভারী ঝোলা দুটো বাইকে ঝুলিয়ে , রওনা দিল । আমি শেষ বিকেলের আবছা আলোয় আমার “সাত রাজার ধন ” কে এক হাত দিয়ে বুকে চেপে , আর এক হাত দিয়ে প্র্যাম ঠেলতে ঠেলতে ঘরে ফিরলাম ।

এর কিছুদিন পর বাবা মা কে চিঠিতে প্রথম খবর হিসেবে লিখলাম ,

” আমার শ্রী , তোমাদের বাবলি এতোদিনে আমায় “মা ” বলে ডেকেছে। ”

Source:

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেন

Create Account



Log In Your Account